মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি শুধু মুসলমানদের নবী?

শয়তান মহব্বত ও বিশ্বাসের লাইনে মানুষের মস্তিষ্কে বড় একটি ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছে। তা হলো আল্লাহ তাআলা হলেন শুধু আমাদের ও মুসলামনদের প্রভু। জনাব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মুসলমানদের নবী। কুরআন কারীম শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ। যেমন ঈসা আ. খ্রিস্টানদের নবী, ইঞ্জিল খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গ্রন্থ। অনুরূপভাবে মুসা আ. ইয়াহুদীদের নবী, তাওরাত ইয়াহুদীদের ধর্মীয় গ্রন্থ। জনাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কুরআনের ক্ষেত্রে এমন ধারণা মহান জুলুম এবং দাওয়াতের কাজে বড় বাধা। যার কারণে সকল অমুসলিম এমনকি মুসলমানরাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শুধু মুসলমানদের নবী মনে করে। বরং কুরআনে কারীম সকল মানুষকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন স্থানে ঘোষণা করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

{قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ}

‘বলে দাও, হে মানবম-লী। তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রাসূল, সমগ্র আসমান ও জমিনে তার রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহর ওপর, তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর ওপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহর এবং তাঁর সমস্ত কালামের ওপর। তাঁর অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।। 

{ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ}

‘আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’  

এক স্থানে আরও আলোচনা হয়েছে।

{تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا} [الفرقان : ১]

পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফয়সালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হয়। 

{يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ}

হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পারবে।

কুরআনে কারীমের কোনো একটি আয়াতে এই কথা প্রমাণিত হয় না যে, আল্লাহ তাআলা শুধু মুসলমানের প্রভু। কুরআন শুধু মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ। ইসলাম শুধু মুসলমানদের ধর্ম। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মুসলমানদের নবী। অথবা শুধু মুসলমান, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত। বরং ইসলামের সর্বস্বীকৃত বিশ^াস হলো আল্লাহ তাআলা পুরো সৃষ্টিজগতের ¯্রষ্টা, মালিক ও একমাত্র উপাস্য। আর কুরআন কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের জন্য জীবন বিধান। শুধু ইসলামই হলো সকল মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য ধর্ম। এছাড়া আর কোনো ধর্ম মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। 

{وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ}

‘যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত।’ 

এমনিভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের রাসুল। তাঁর আগমনের পর থেকে কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকল মানুষ রাসুুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত। হুদাইবিয়া সন্ধি থেকে ফিরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের  মসজিদে নববীতে একত্রিত করে খুবই গুরুত্ব সহকারে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে সুস্পষ্টভাবে এই ভুল ধারণা দূর হয়ে যায়। তিনি বললেন,

হে লোকেরা! আল্লাহ তাআলা আমাকে সকল মানুষের জন্য রহমত এবং রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন। আমি সমস্ত পৃথিবীর জন্য আল্লাহর রাসূল হয়ে এসেছি। তাই আসমান জমিনের স্রষ্টার বার্তা সমস্ত পৃথিবীতে পৌঁছিয়ে দিতে চাই। যাতে আল্লাহর হুজ্জত প্রমাণপূর্ণ হয়ে যায়। আল্লাহর দাওয়াত ও তার পয়গাম থেকে পৃথিবীর কোনো গোত্র যেন বঞ্চিত না হয়। যাও আল্লাহর ওপর ভরসা করে দুনিয়ার বাদশাদের আল্লাহর পয়গাম পৌঁছাও। দেখ তোমাদের জীবন তোমাদের অস্তিত্ব আল্লাহর। আল্লাহর বান্দার কাছে তার পয়গাম পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য ওয়াকফ উৎসর্গ হতে হবে। ওই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর জান্নাত হারাম, মানুষের সাথে লেনদেন করে কিন্তু তাদেরকে ভালো কাজের দিকে ডাকে না ভালো কাজের উপদেশ দেয় না।

এই ভুল ধারণার কারণে মুসলমানদের কখনো এই তাওফিক হয় না যে, তার মানবীয় ভাই অমুসলিমদের কাছে আল্লাহ, রাসূল, কুরআন, ইসলামের পরিচয় করাবে। বিদ্বেষ আর কঠোরতার এই পরিবেশের কারণে অমুসলিম ভাইদেরও কুরআন ও ইসলামের পরিচয় করা সম্ভব হয় না। ফলে একধরনের বিরোধী গোষ্ঠীর ধর্ম ও ধর্মীয় গ্রন্থ মনে করে। এজন্য ইসলাম প্রচারের সবচেয়ে জরুরী বিষয় হলো বরং আসল দাওয়াত হলো এটাই- অমুসলিম এবং মুসলমানদের মাথা থেকে এই ভুল ধারণাগুলো দূর করা।

শয়তান খুব সুন্দরভাবে মানুষের মধ্যে এসব ভুল ধারণা ব্যাপক করে দিয়েছে। ফলে মানুষের সবচেয়ে জরুরী জিনিস ঈমান এবং মুসলমানদের মূল উদ্দেশ্য নবুওয়াতের কাজ দাওয়াত থেকে বঞ্চিত করছে।

দাওয়াতের উদ্দেশে অমুসলিমদের কুরআন দেওয়া      

আমাদের ধারণা হলো, অমুসলিমরা মুশরিক, তারা নাপাক, তাদেরকে কি কুরআন শরীফ দেওয়া যাবে? তাদের মসজিদে আসা জায়েজ হয় কীভাবে? একজন কাফের মুশরিক তাদের নাপাক মুখ দিয়ে আমাদের নবীর নাম নেয় কীভাবে? ওইদিকে অমুসলিমদের ধারণা হলো, মুসলমান হলো রক্তপিপাসু, তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত মূর্খ ও নিকৃষ্ট জাতি। যাদের ধর্মের ভিত্তিই হলো এক একজন কাফের মুশরিক হত্যা। ফলে তাদের ধর্ম, তাদের ধর্মীয় কিতাব আমরা কীভাবে গ্রহণ করতে পারি? তাদের কিতাব পড়া ও এ বিষয়ে চিন্তা ফিকির করা কীভাবে বৈধ হবে?

  কিছুদিন আগের ঘটনা, আমাদের একজন নওমুসলিম ভাই, যিনি একজন ভালো দায়ী, তার বাবা মন্দিরের বড় একজন নেতা ও প-িত। ভাইটি নিরবচ্ছিন্নভাবে তার বাবার পেছনে দাওয়াতী মেহনত করছিল। তার দরদমাখা মেহনতের ফলে ফুলাতে এসে তার বাবা মুসলমান হন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কুরআন কারীমের হিন্দি একটি অনুবাদ চাইলেন। তাকে কুরআন দেওয়ার পর তিনি কুরআনকে কপালে, চোখে লাগাচ্ছিলেন, চুমু খাচ্ছিলেন, বললেন আমি পূর্বেও এই কুরআন পড়েছি, তখন এটাকে মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে পড়ছি।

আমি স্বপ্নেও ধারণা করিনি এটা আমার মালিকের গ্রন্থ। আমার জন্য আমার মালিক পাঠিয়েছেন। এখন আমি আমার মালিকের পক্ষ থেকে কিতাব মনে করে পড়বো।

    দাওয়াতের একটি দিক হলো বরং আসল দাওয়াতই হলো এটা যে, মুসলমানদের এই ভুল ধারণা দূর করা,  মুসলমানের অন্তরে প্রবেশ করানো যে, সকল মানুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত। আর রাসূল আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষের রাসূল ও পথ প্রদর্শক। কুরআন কারীম সকল মানুষের ধর্মীয় গ্রন্থ ও জীবন বিধান। ইসলাম সকল মানুষের ধর্ম ও চিরস্থায়ী সংবিধান। এই পয়গামটি মুসলিম জাতির কাছে আমানত। সকল মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছানো মুসলমানদের দুনিয়াতে আগমনের মূল উদ্দেশ্য ও ঈমানী দায়িত্ব। এমনিভাবে অমুসলিমদেরকে খুব দরদ ও ভালোবাসার মাধ্যমে বোঝানো যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার জন্যও প্রেরিত হয়েছেন। তিনি আপনার নবী। তিনি আপনার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের হিতাকাক্সক্ষী। আপনার পথপ্রদর্শক। কুরআন কারীম হলো আপনার মালিকের পক্ষ থেকে পাঠানো আপনার জন্য তার কালাম। ইসলাম হলো আপনার স্রষ্টার পক্ষ থেকে একমাত্র জীবন বিধান ও ধর্ম। এগুলো মুসলমানদেরকে যতটুকু স¤ো^ধন করে আপনাকেও ততটুকু সম্বোধন করে।

   দাওয়াতের পথে আরও একটি ভুল ধারণা পাওয়া যায়। জাতির বিশেষতম লোকদের একটি দল এমন আছে যাদের ধারণা হলো, ইসলাম পূর্ণভাবে কিতাবের আকৃতিতে ছেপে আসছে। প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব হলো সে সত্যকে খুঁজবে। আর ইসলামী শিক্ষাকে ব্যাপক করে দেওয়ার দ্বারা মুসলমানদের পক্ষ থেকে একমালে হুজ্জাত হয়ে গেছে। তাই এখন ইসলাম প্রচারের কাজ বেশি থেকে বেশি মুস্তাহাব কাজ। এই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমাদের এখানে ‘ইসলামের দাওয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ জিম্মাদারী’ নামে মাওলানা আতিক আহমাদ বস্তবি সাহেবের একটি বই বের হয়েছে। যার মধ্যে তিনি বড় বড় ফকিহদের অভিমত পেশ করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ একে ফরজে কেফায়া বলেছেন, কেউ আবার বলেছেন ফরজে আইন সাধ্যানুযায়ী, যেমন হজ, যাকাত। ফরজে কেফায়ার ক্ষেত্রে মাওলানা খুব সুন্দর কথা লিখেছেন। তা হলো ফরজে কেফায়া দ¦ারা আমাদের মাথায় জানাজার নামাজের কথা আসে। কিছু মানুষ যদি জানাজার নামাজ আদায় করে নেয়, তাহলে সবার পক্ষ থেকে ফরজ আদায় হয়ে যাবে। সম্মানিত লেখক বিভিন্ন উলামার ভাষ্য উল্লেখ করে একথা প্রমাণিত করেছেন যে, ফরজে কেফায়ার মাধ্যে আমলের পূর্ণতা উদ্দেশ্য। কোনো কাজের পূর্ণতা যদি একজনের দ্বারা হয়ে যায় তাহলে সকলের পক্ষ থেকে ফরজ আদায় হয়ে যাবে। আর সকল মানুষ কাজে লেগে যায় শুধু একটি মানুষ কাজ থেকে উদাসীন আর কাজও পূর্ণ হচ্ছে না, তাহলে যারা কাজে লেগে আছে তারাতো ফরজে কেফায়া তরকের পাপ থেকে বেঁচে যাবে। কিন্তু সেই একজন ব্যক্তি ফরজে কেফায়া তরক করার গোনাহ বহন করবে। তার জন্য সকলের কাজে লেগে থাকা উপকৃত হবে না।

   এই দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো মানব জাতির কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো ফরজে কেফায়া। শুধু এতটুকু নয় যে, আপনি পৌঁছিয়ে দিলেন, আর মনে করলেন পৌঁছে গেছে। বরং এরজন্য এতমামে হুজ্জাত হওয়া শর্ত। হযরত মাওলানা আলী মিয়া নদভী রহ. বলতেন, দাওয়াতের জন্য এতমামে হুজ্জত হলো, মাদউ যেন বুঝে এবং বিশ^াস করে, ইসলামই সত্য ধর্ম এবং মুক্তির পথ। এছাড়া আর কোনো ধর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।  দায়ী আমার কল্যাণের জন্যই কোনো বিনিময় ছাড়া লোভ লালসা ছাড়াই, আমার কাছে এই বার্তা পৌঁছাচ্ছে। মাদ‘উ যদি ইসলামকে সত্য ধর্ম বলে বুঝতে পারল না, তাহলে এখনো এতমামে হুজ্জাত হয়নি। এমনিভাবে পুরো মানব জাতির কাছে এতমামে হুজ্জত জরুরী। এই কাজের পূর্ণতার দায়িত্ব হলো পুরো মুসলিম জাতির ওপর। কাজের পূর্ণতা যতক্ষণ পর্যন্ত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত একমালে হুজ্জত হবে না। হুজ্জত কায়েম না হওয়া পর্যন্ত যারা কাজে লেগে থাকবে তারা ফরজ তরক করার গোনাহ থেকে বেঁচে যাবে। আর যারা কাজে লেগে থাকবে না। কাজ থেকে উদাসীন থাকবে তারা ফরজে কেফায়া ছেড়ে দেওয়ায় গোনাহগার হবে।