মুহাম্মদ হাসান (রবীন্দ্র মালিক)-এর সাক্ষাৎকার

দুআ করুন। আল্লাহ তাআলা যেন ঈমানের ওপর জামিয়ে রাখেন। মানুষ আজ ইসলামের ওপর চলার মুকাবিলায় আগুনে দগ্ধ হওয়াকে সহজ মনে করছে। তাদের জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। আমি মাত্র আট দিনের মুসলমান। আমি আর কী পয়গাম দেবো। তবে গত এক মাস আমি ইসলাম সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তা হল, ঈমান রক্ষা করা এবং বৃদ্ধি করার সবচেয়ে সহজ উপায় হল ঈমানকেই অন্যদের নিকট সাফ সাফ পৌঁছে দেয়া।
আহমদ আওয়াহ : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
মুহাম্মদ হাসান : ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্ন : ভাই রবীন্দ্র মালিক সাহেব! গত রবিবার আপনি ফুলাত এসেছিলেন। আব্বু তখন আপনার ঘটনা শুনিয়েছিলেন। এই রবিবারে এসেছেন তো আপনার সাক্ষাৎকার গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের এখানে ফুলাত থেকে আরমুগান নামে একটি উর্দু ম্যাগাজিন বের হয়। মালিক স্বীয় অনুগ্রহে যাদের হেদায়াত দিয়ে কালিমা পড়ে ইসলাম গ্রহণের তৌফিক দিয়েছেনÑ ম্যাগাজিনটিতে তাদের আত্মকথা ছাপা হয়।
উত্তর : জী মাওলানা সাহেব! হযরত এইমাত্র আমাকে বলে গিয়েছেন। আজই আমি মুরাদাবাদ থেকে এসেছি আবার আজকেই ফিরে যেতে হবে। গতমাসে সেখানে বদলী হয়েছিলাম এখন আবার লক্ষেèৗ যেতে হচ্ছে। একে তো সরকারী চাকুরী তা-ও আবার পুলিশের। বিছানা সব সময় বাঁধাই থাকে।
প্রশ্ন : এটা তো বেশ ভালো কথা! আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুনিয়াতে এমনভাবে অবস্থান করো যেনো তুমি এক প্রবাসী কিংবা পথিক।”
উত্তর : এটা তো তখন যখন স্বেচ্ছায় নিজেকে মুসাফির বানানো হবে। কিন্তু বিছানা সব সময় বেঁধে রাখলাম আর আশা করলাম হাজার বছর বেঁচে থাকি- এমন মুসাফির হওয়ার কী ফায়দা? হাদীসে বর্ণিত মুসাফির তো মানুষ তখনই হতে পারে যখন আখেরাত তার সামনে বাস্তব হয়ে ধরা দেয়। যেমন হাদীসে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা বিবৃত হয়েছে। জান্নাত, জাহান্নামের প্রতি তাদের এমন প্রত্যয় জন্মেছিল যে, চাক্ষুষ অবলোকন করলেও আশ্চর্যিত হতেন না।
প্রশ্ন : নিঃসন্দেহে আপনার কথা সত্য। মাশাআল্লাহ! এক সপ্তাহে আপনার অনুভব-উপলদ্ধি অনেক বেড়ে গেছে।
উত্তর : অনুভব উপলদ্ধির জন্য এক মিনিটই যথেষ্ট। আর বুঝতে না চাইলে সহস্র বর্ষও অর্থহীন। গরু-মহিষের মতো জীবন কাটিয়ে চলে যাবেন প্রকৃত নিবাসের কথা চিন্তায়ও আসবে না।
প্রশ্ন : আপনি সত্য কথাটিই উচ্চারণ করেছেন। এখন অনুগ্রহপূর্বক আপনার পরিচয় বলুন!
উত্তর : প্রকৃত পরিচয় তো কুরআনই বলে দিয়েছেÑ পঁচা কাদামাটি থেকে গঠিত, নাপাক বীর্য থেকে সৃষ্ট এক মানুষ। সাতাশতম পারায় তিলাওয়াত করছিলাম। আল্লাহ তায়ালা কেমন আশ্চর্য ভঙ্গিতে বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাতৃগর্ভ হতেই জানেন। কেন নিজের সাফাই গেয়ে বেড়াচ্ছো। মাতৃগর্ভে আমরা তো ঋতুস্রাব পান করে লালিত হয়েছি, কাল মরে গিয়ে মৃত্তিকায় পরিণত হবো, আর বর্তমানে দুই কিলো মল পেটে নিয়ে ঘুরছি। ঘামে দুর্গন্ধ, মলে দুর্গন্ধ, মূলে দুর্গন্ধ। দুদিন দাঁত না মাজলে মুখের ভেতরও মলের দুর্গন্ধ। ব্যস এটাই এক নাপাক মানুষের পরিচয়। এই নিয়েই প্রত্যেকে বগল বাজায়- আমি অমুক, আমি তমুক।
প্রশ্ন : এটা তো উঁচু মাপের দার্শনিক পরিচয়। আমি আসলে আপনার পারিবারিক পরিচয় জানতে চেয়েছিলাম।
উত্তর : মীরাঠ জেলার এক জাট পরিবারে ২রা অক্টোবর ১৯৫৪ সালে আমার জন্ম। পিতাজী কৃষিকাজের পাশাপাশি একটি সরকারী চাকুরীও করতেন। জ্যাঠা মশাই ডি. এস. পি থেকে রিটায়ার হয়েছেন। এক ফুফাও পুলিশে ছিলেন। বড়োত থেকে ইন্টারমডিয়েট ও গ্রাজুয়েশন করেছি। সাব পুলিশ ইন্সপেক্টরের চাকুরী পেয়ে যাই। পাঁচ বছর পূর্বে প্রমোশন পেয়ে ইন্সপেক্টর হয়ে যাই। কিছু দিন সাহারানপুরে ছিলাম। দুই বছর ছিলাম মুজাফফার নগর আর মীরাঠে। জুলাইয়ের শুরুতে মুজাফফরনগর সি,আই,ডিতে ছিলাম। একমাস পূর্বে মুরাদাবাদ ট্রান্সফার হয়েছি। এখন আবার প্রমোশন পেয়ে লক্ষেèৗ যেতে হচ্ছে। দুটি রুটি যা আল্লাহ তাআলা পূর্বেই ভাগ্যে লিখে রেখেছেন তার জন্য কেমন ঠোকর খেতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে দুঃখে মন বিষিয়ে ওঠে।
প্রশ্ন : আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলুন!
উত্তর : জানেন নিশ্চয়ই হযরত গত মে মাসে কান্ধালায় সপ্তাহব্যাপী দাওয়াতী ট্রেনিং ক্যাম্প বসিয়েছিলেন?
প্রশ্ন : হ্যাঁ, আসলে দিল্লীতে তখন তিন মাসের ক্যাম্পেইন চলছিল। তারই প্রাকটিক্যাল হিসেবে কান্ধালায় এক সপ্তাহর ক্যাম্পটি বসেছিল।
উত্তর : জ্বী, সেই ক্যাম্পের কথাই বলছি। কান্ধালার অবস্থা তখন ক্যাম্পের অনুকূল ছিল না। দুদিন আগেই এক মুসলমান একজন হিন্দুকে হত্যা করেছিল। তাছাড়া একটি মেয়ের ব্যাপারে হিন্দু মুসলমানের বাঁধা-বাঁধি চলছিল। এদিকে দুটি হিন্দু ছেলে মুসলমান হয়ে গ্রাম ছেড়েছিল। তাদের পরিবার উগ্র হিন্দু সংগঠন নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছিল। এমনই নাযুক সময়ে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। পরিবেশ বাহ্যত, ক্যাম্পের উপযোগী ছিল না। কিন্তু পূর্ব প্রোগ্রাম অনুযায়ী ক্যাম্প বসানোর সিদ্ধান্ত ছিল। কোনো কোনো দায়িত্বশীল মানাও করলেন। কিন্তু হযরত বললেন, প্রতিকূল পরিবেশে ক্যাম্পের ফায়দা অধিক হয়ে থাকে। তাছাড়া এটাও স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, সত্যের প্রচারক, প্রেম ভালোবাসার বার্তাবাহক ও হিতাকাক্সক্ষীদের জন্য কোনো সমস্যাই সমস্যা নয়।
প্রথম দিন কর্মীরা যখন ফিল্ড ওয়ার্কে (অমুসলিম ভাইদের দাওয়াত দিতে) গেলেন, অশান্তিকামীরা ক্ষেপে উঠল। পরদনি দৈনিক জাগরণ সংবাদ ছাপল, “সৌদি আরব থেকে লোক এসেছে। ধর্মপ্রচার করে পরিবেশ নষ্ট করছে। আপত্তিকর বইপুস্তক বিতরণ করছে।” এতে বিরাট একটা হৈ চৈ পড়ে গেল। মুসলমানারও ঘাবড়ে গেল। কান্ধালার এক দায়িত্বশীল ও পৃষ্ঠপোষক হযরতকে এবং তাঁর লোকদের বলল, আপতত ক্যাম্প গুটিয়ে নিন। কান্ধালা থানা ইনচার্জ স্থানীয় ক্যাম্পের আহ্বায়ক দায়িত্বশীল মৌলভী উসামা কান্ধালবীকে তৎক্ষণাৎ ক্যাম্প বন্ধ করার চাপ দিল। তিনি হযরত মাওলানার সঙ্গে ফোনে পরামর্শ করে ক্যাম্পটি কেরানা অথবা শামেলী স্থানান্তরের খেয়াল ব্যক্ত করলেন। হযরত বললেন, আপনি দারোগাকে বলুন, এটা আমাদের আইনী অধিকার। আমাদের কারণে পরিবেশ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে তখন বলবেন। ক্যাম্পের দায়িত্বশীল মাওলানা উওয়াইস নানুতবী থানা ইনচার্জের সঙ্গে সাক্ষাত করে তাকে নিশ্চিন্ত করলেন। কিন্তু স্থানীয় জনগণের মধ্যে ভীতি রয়ে গিয়েছিল। এক যিম্মাদার তো দাঙ্গার ভয়ে কান্ধালা ছেড়ে চলেই গিয়েছিল।
পত্রিকার সংবাদের প্রেক্ষিতে আমাকে এবং আমার এক সাথীকে কান্ধালা পাঠানো হয়। আমরা প্রথমে কান্ধালা থানায় যাই। একজন পুলিশকে সাথে নিয়ে জামে মসজিদ পৌঁছি। লোকজন বলল, দায়িত্বশীল কোথাও গিয়েছেন। আমরা বললাম, আসলে তাকে আমাদের কাছে যেতে বলবেন। আমরা মসজিদ থেকে চলে যাচ্ছিলাম পথে দুজন মাওলানার সঙ্গে সাক্ষাত হল। একজন মাওলানা উসামা যিনি স্থানীয় আহ্বায়ক ছিলেন। আপরজন মৌলভী উওয়াইস যিনি ক্যাম্পের আমীর ছিলেন। দুজনই আমাদের থামিয়ে দিলেন যে, আমরা আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে থানায় গিয়েছিলাম। জরুরী কথা আছে। মৌলভী উসামার বাড়িতে গিয়ে বসলাম। মৌলভী উওয়াইস আমাদের বললেন, আমি আপনি এক পিতা মাতার সন্তান। রক্ত সম্পর্কীয় ভাই। মৃত্যুর পরে এক চিরস্থায়ী জীবন রয়েছে। যে মালিক আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাদের আপনাদের একক মালিক। দুনিয়ার এই জীবনে তিনি আমাদের কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।
যখন জানতে পেলাম আপনারা মুজাফফর নগর থেকে এসেছেন, ভাবলাম মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে আপনাদের সঙ্গে কিছু আলোচনা করা দরকার। এই উদ্দেশ্যেই আমরা থানায় গিয়েছিলাম। তারপর তিনি কুরআন পাঠ করে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, মৃত্যুপরবর্তী হিসাব-কিতাব সম্পর্কে বলে যাচ্ছিলেন। মাওলানা সাহেবের মুখে আরবী কুরআন শুনে আমরা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিলাম। তিনি আমাদের মৃত্যু পরবর্তী চিরস্থায়ী আগুন থেকে মুক্তিলাভের জন্য কালিমা পড়ে মুসলিম হয়ে যেতে বললেন এবং হযরতের কিতাব আপকি আমানত ‘আপকি সেবা মে’ উপহার দিলেন। আমি কিতাবটি নিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখলাম। জিজ্ঞেস করলাম, এটাই কি সেই কিতাব যা ফুলাতের এক ভদ্রলোক লিখেছেন? বললেন, হ্যাঁ, এটাই সেই কিতাব। বললাম, এই কিতবাটিরই কি মহারাষ্ট্রে সত্যায়ন হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ, এই কিতবাটিই। আমরা ফুলাতের সেই ভদ্রলোকের পক্ষ থেকেই এসেছি। জানতে চাইলাম, সৌদী আরব থেকে এসেছে এবং আপত্তিজনক পুস্তক বিতরণ করছে তারা কারা? মাওলানা উওয়াইস বললেন, জনাব! সৌদী আরব থেকে কেউ আসেনি। আমরাই সেই লোক।
আমরা শুধু এই কাজই করি যার জন্য আপনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম আর বইপুস্তক বলতে শুধু এই কিতাবটিই বিতরণ করি। তার দরদপূর্ণ কথাগুলো আমাদের মর্মমূল স্পর্শ করল। বললাম, এখন আমরা দৈনিক জাগরণের রিপোর্টারের কাছে যাবো। তাকে স্বাগতম জানাতে এক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে যাবো। কারণ, সে যদি দয়া করে এই খবর না ছাপত তাহলে এমন ভালো মানুষের সঙ্গেও আমাদের দেখা হতো না, এমন ভালো ভালো কথাও শোনা হতো না আর এই কিতাবেরও দেখা পেতাম না।
প্রশ্ন : উওয়াইস ভাই আপনাকে কালিমা পড়তে বলেছিলেন। আপনি কালিমা পড়েন নি?
উত্তর : না, আমি ভেবে-চিন্তে দেখার সুযোগ চেয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি কিতাবটি এক-দুই বার পড়ে আপনার সঙ্গে দেখা করবো।
প্রশ্ন : তারপর কী হল?
উত্তর : বাড়হানায় আরেকটি ইনকোয়ারি ছিল। আমরা বাড়হানা হয়ে মুজাফফর নগর চলে যাই। রাতের বেলা ‘আপকি আমানত’ নিয়ে বসলাম। কিতাবটি আমার মনমস্তিষ্কের সমস্ত জঞ্জাল সাফ করে দিল। ইসলামের জন্য হৃদয়ে জায়গা প্রস্তুত হল। বছরখানেক আগে একটা কেসের ব্যাপারে ডক্টর কমরজানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়েছিল। আমি তাকে ইসলাম সম্পর্কে আরও কিছু কিতাব সংগ্রহ করে দিতে বলি। তিনি বললেন, ভালো কথা, চলুন আমরা ফুলাত চলে যাই। সেখান থেকে এ ব্যাপারে সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। এক রবিবারে আমরা ফুলাত গেলাম। কিন্তু মাওলানা সাহেবকে পেলাম না। তবে সেখান থেকে কিতাব সংগ্রহ করা গেল। ‘ইসলাম এক পরিচয়’, মরণে‘কে বাদ কিয়া হোগা’ এবং কুরআন মাজীদ হিন্দী অনুবাদ সংগ্রহ করে চলে আসলাম। এই কিতাবগুলো বিশেষ করে কুরআন মাজীদ পড়ে ইসলাম আমার কাছে ভালো লেগে যায়। কিন্তু গোটা সমাজের সঙ্গে টক্কর দেয়াটা আমার নিকট অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য সিদ্ধান্ত নেয়ার হিম্মত করতে পারছিলাম না। সে সময় মুরাদাবাদ আমার ট্রান্সফার হয়ে যায়। কিন্তু সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার খাতিরে তখনও বাসা বদল করিনি। স্কুলে একটি ফাংশান ছিল। সেজন্য দুদিনের ছুটি নিয়ে মুজাফফর নগর এসেছিলাম।
রমজানের চারদিন আগের কথা। আমি কুরআন পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখি, এক মসজিদে জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তি বসে আছেন। আহা! সেকি নূরানী মুখাবয়ব। শ্বেত-শুভ্র পাগড়ি পরিহিত। আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, বৎস! তুমি কি ইসলাম বুঝতে পেরেছো? বললাম জী! পুরোপুরি বুঝে এসেছে। আবার জিজ্ঞেস করলেন, আপকি আমানত পড়ো নি? বললাম জ্বী, পড়েছি। বললেন, বুঝে এসেছে? বললাম, হ্যাঁ, বিলকুল বুঝে এসেছে। বললেন, যখন বুঝেই এসেছে তাহলে ইসলাম গ্রহণ করছো না কেন? বিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জলদি করো। আরেকবার আপকি আমানত পড়ো। স্বপ্নের পরিবেশ বদলে গেল। আমি সেখান থেকে ফিরে আসলাম। স্বপ্নেই ডক্টর কমর জান সাহেবের সঙ্গে দেখা হল। জিজ্ঞেস করলেন, সাক্ষাত হয়ে গেল? বললাম, কার সঙ্গে? বললেন, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে? আমি ডাক্তার সাহেবেকে পুরো ঘটনা খুলে বললাম। ডাক্তার সাহেব বললেন, তিনি বাস্তব কথাটিই বলেছেন। তাঁর চেয়ে সত্য আর কে হবে। তিনি সকলের সেরা সত্যবাদী। তিনি এমনই সত্যবাদী যে, তার জান-ঈমানের শত্র“ও তাকে সত্যবাদী বিশ্বাসী বলে ডাকতো। আমার চোখ খুলে গেল। রাত তিনটা বাজছে। পার্শ্ব পরিবর্তন করে ঘুমাতে চাইলাম কিন্তু কোথায় ঘুম! বাচ্চারা শুয়ে আছে। আমি বাথরুমে গিয়ে গোসল করলাম। ড্রয়িং রুমে গিয়ে আরেকবার আপকি আমানত পড়লাম।
সিদ্ধান্ত নিলাম সকালেই ফুলাত যেতে হবে। মোটর সাইকেল নিয়ে ডাক্তার কমরের ওখানে গেলাম। ঘটনাক্রমে তিনি মঙ্গলো গিয়েছিলে। সকালে বাচ্চাদের স্কুলের ফাংশানে যাওয়ার কথা ছিল। ডক্টর সুরেন্দ্র একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল চালাতেন। ঈইঝঊ বোর্ডের প্রথম শ্রেণীর স্কুল। কয়েকটি সায়েন্স এক্সিবিশনও তারা দিয়েছিল। ইউপি সরকারের অ্যাওয়ার্ড ছিল তাদের দখলে। স্কুলে পৌঁছলাম। সিআইডিতে থাকার কারণে ডক্টর সাহেব আমাকে যথেষ্ট খাতির করতেন। প্রোগ্রাম শেষে তার সঙ্গে সাক্ষাত হল। আমার হাতে ছিল আপকি আমানত। দেখে বললেন, এটা কোথায় পেয়েছেন, এটা তো আমাদের ফুলাতের হযরতওয়ালার কিতাব? আমি ডক্টর সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তাকে জানেন? ডক্টর সাহেব বললেন, আমার স্কুলের উদ্বোধন তো তিনিই করেছেন।
এক মৌলভী বন্ধু আমাকে ফুলাত নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত দরদী মানুষ। আমাকেও এই কিতাব হাদিয়া দিয়েছিলেন। তার আশীর্বাদেই আমার স্কুল এতো উন্নতি করছে। এই স্কুলে তিনি তিনবার এসেছেন। তিনি ছিলেন সায়েন্সের তুখোড় ছাত্র। জিজ্ঞেস করলাম, ডক্টর সাহেব আপনি কিতাবটি পড়েছেন? বললেন, হ্যাঁ, পড়েছি। বললাম, কোনো কিছু বুঝে এসেছে? বললেন, কিতাবটিই এমন যে, পাঠকের একথা বলার অবকাশ নেই, কিছু বুঝে আসেনি! জিজ্ঞেস করলাম, তা কী সিদ্ধান্ত নিলেন? ডক্টর সাহেব বললেন, সিদ্ধান্ত তো নিতেই হবে কিন্তু সমাজের সঙ্গে লড়াই করার হিম্মত পাই না। রাতের বেলা মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে পড়ি, হায়! আজ যদি মারা যাই তাহলে তো নরকের আগুনে জ্বলতে হবে। চিন্তা করি সকালেই ফুলাত গিয়ে দ্বীন গ্রহণ করি, কিন্তু সকালে উঠে আর হিম্মত পাই না। গত সপ্তাহয় তো হযরত তিন তিন বার স্বপ্নে দেখা দিয়েছেন। বলেছেন, ডক্টর সাহেব! আমাদের ভালোবাসা উপেক্ষা করে মুক্তি পাওয়া যাবে না। গত পরশু বলছিলেন, ডক্টর সাহেব! মুসলমান তো হতেই হবে। এবার আমিও ডক্টর সাহেবকে নিজের অবস্থা খুলে বলি এবং প্রস্তাব করি, চলুন, দুজন একসঙ্গেই রওয়ানা দেই। ডক্টর সাহেব বললেন, হযরতকে পাওয়া তো কঠিন ব্যাপার। আমি বললাম, ডাক্তার কমর সাহেবকে ধরে সময় ঠিক করে নেবো।
আমি স্বস্তিবোধ করলাম যে, যাক জরুরী অথচ সুকঠিন সফরে একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। ডাক্তার কমর সাহেবকে ফোন করলাম। তিনি পরবর্তী রবিবার সময় নির্ধারণ করলেন। আমি মুরাদাবাদ চলে গেলাম। রবিবার পর্যন্ত সময়টা আমার বড় কষ্টে কাটল। বার বার মনে পড়তো আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বিলম্ব করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। না জানি আবার কিছু হয়ে যায়। আল্লাহ আল্লাহ করে রবিবার আসল। আমি শনিবারেই মুজাফফর নগর চলে গেলাম। পরদিন সকাল নয়টার সময় ডক্টর সুরেন্দ্র ডক্টর কমরকে নিয়ে ফুলাত পৌঁছলাম। লোকজন বলল, সকাল দশটায় হযরত মাসজিদে যাবেন। সেখানে দেখা করতে পারবেন।
আমি যেহেতু লক্ষেèৗ বদলী হওয়ার সংবাদ পেয়েছিলাম। এজন্য চাচ্ছিলাম, সেদিনই মুরাদাবাদ ফিরে যাবো। কাজেই তাড়াহুড়োও ছিল। আমি একটা বাচ্চাকে বলে পাঠালাম, মুজাফফার নগর থেকে সি আই ডি এসেছে, জরুরী ভিত্তিতে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। হযরত বলে পাঠালেন, একটু অপেক্ষা করুন নামায পড়ে আসছি। সঙ্গে আবার পানিও পাঠিয়ে দিলেন। হযরত সাহেব আসলেন। বললাম, হযরত মাফ করবেন। আমার আসলে তাড়াহুড়া আছে এজন্য সি আইডির কথা বলে পাঠিয়েছি। এমনিতে আমি সিআইডি ইন্সপেক্টর তবে এসেছি নিজের গরজে। হযরত বললেন, আমি এজন্য তাড়াতাড়ি এসেছি যে, আপনারা আমার মেহমান।। কোনো কারণে হয়তো তাড়া আছে। আপনি যদি কোনো সরকারের সিআইডি হয়ে থাকেন, তাহলে মালিকের দয়া, আমরা এক বড় সরকারের রাষ্ট্রদূত ও অফিসার। ডক্টর কমর সাহেবকে হযরত ভালো করেই চিনতেন। ডক্টর সুরেন্দ্রকেও জানতেন। স্কুল এবং বাড়ির খোঁজ খবর জিজ্ঞেস করলেন। ডক্টর কমর সাহেব বললেন, ইনি রবীন্দ্র মালিক সিআইডি ইন্সপেক্টর। আর এই যে ডক্টর সুরেন্দ্র- আপনার পুরনো মুরীদ। এঁরা কালিমা পড়তে এসেছেন। হযরত বললেন, এত দেরী করলেন কেন, আপনারই উচিত ছিল এঁদেরকে কালিমা পড়িয়ে দেয়া। এদের কারো ইন্তেকাল হয়ে গেলে তো সবার জন্যই জবাবদিহির আশংকা ছিল। হযরত সাহেব কালিমা পড়িয়ে দিলেন। বললেন, নাম পরিবর্তন করা জরুরী নয় তবে বদলে নিলে ভালো। মানুষের ওপর নাম পরিবর্তনের বেশ প্রভাব পড়ে যে, কুফর শিরক তো ছেড়েছেই সেই সঙ্গে কুফুর-শিরকের সঙ্গে সম্পৃক্ত নামও ছেড়ে দিয়েছে। আপনি আপনার নাম মুহাম্মাদ হাসান আর ডক্টর সুরেন্দ্র সাহেব তার নাম মুহাম্মদ হুসাইন রেখে দিন। এরা দুজন ছিলেন আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় দৌহিত্র, হযরত আমাদেরকে আমৃত্যু ঈমান হেফাজত করার জোর তাগিদ দিলেন। বললেন, ঈমান হেফাজতের নিয়ম হল, আপনি ঈমানের এই সত্যতার প্রতি সবাইকে বিশেষত পরিবারের লোকজনকে নম্রতা ও মহব্বতের সাথে দাওয়াত দিতে থাকুন। তিনি আরও বললেন, পরিবারের সঙ্গে দরদপূর্ণ কোমল আচরণ করবেন যেন তারা বুঝতে পারে নিশ্চয়ই কিছু একটা তাকে এভাবে বদলে দিয়েছে। ফলে তারা ইসলামকে এই পরিবর্তনের কারণ মনে করে তা গ্রহণ করে নিবে।
প্রশ্ন : মাশাআল্লাহ! আপনি অতঃপর পড়া শুরু করেছেন?
উত্তর : আমি প্রথমে মুরাদাবাদ চলে যাই। সেখান থেকে লক্ষেèৗ যাই। লক্ষেèৗ যাওয়ার পথে ট্রেনে দুই ব্যক্তিকে দাওয়াত দিই। আলহামদুলিল্লাহ দুজনেই মুসলমান হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। হযরতের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফোনেই তাদের কালিমা পড়িয়ে দেই। আমি অনুভব করি যখনই আমি কাউকে ঈমানের দাওয়াত দিই ইসলামের প্রতি আমার একীন আরও মজবুত হয়ে যায়।
প্রশ্ন : নামায ইত্যাদি পড়া শুরু করেছেন?
উত্তর : আল্লাহর শোকর! নামায শিখে নিয়েছি। বর্তমানে আদায়ও করছি। রোযাগুলোও সব রেখেছি।
প্রশ্ন : পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমি….
উত্তর : আমি গতকাল রাতে আমার মিসেসের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি। আসলে আমি গত কয়েক মাস যাবত ইসলাম অধ্যয়ন করছিলাম। সে আমাকে বলতো মনে হচ্ছে আপনি মোল্লাদের চক্করে পড়ে গেছেন এবং শেষ পর্যন্ত মুসলমান হয়ে যাবেন। রাতের বেলা আমি তাকে আপকি আমানত শোনাই। তার খুবই ভালো লাগে। বলে, আমি তো ভাবছিলাম হঠাৎ আবার চৌধুরী সাহেবের কী হল? এখন বুঝেছি এই কিতাবের মিষ্টতা ও ভালোবাসা আপনাকে বশ করেছে। আলহামদুলিল্লাহ! সেও কালিমা পড়ে নিয়েছে এবং সহযাত্রী হওয়ার অঙ্গীকার করেছে। আমরা বাচ্চা দুটিকেও কালিমা পড়িয়েছি। ইনশাআল্লাহ! তারা যখন ইসলাম অধ্যয়ন করবে ইসলামই স্বয়ং তাদের মনের জঞ্জাল সাফ করে দিবে।
প্রশ্ন : এখন কি সপরিবারে লক্ষেèৗ শিফট হচ্ছেন?
উত্তর : স্পষ্ট কথা, বেশি দিন পৃথক থাকতে পারব না। হযরত সাহেব বলেছেন, লক্ষেèৗতেই আমার জন্য বেশী সুবিধা হবে। ও দিকে আত্মীয়-স্বজনের ঝামেলা নেই। তাছাড়া দ্বীন অধ্যয়ন ও পালনের জন্যও সেখানে উপযোগী পরিবেশ পাওয়া যাবে।
প্রশ্ন : অনেক অনেক শোকরিয়া হাসান সাহেব! আল্লাহ তাআলা বরকতময় করুন। আপনিও মুবারক হোন, আমরাও মুবারক হই। আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
উত্তর : দুআ করুন! আল্লাহ তাআলা যেন ঈমানের ওপর জামিয়ে রাখেন। মানুষ আজ ইসলামের ওপর চলার মুকাবিলায় আগুনে দগ্ধ হওয়াকে সহজ মনে করছে। তাদেরকে জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। আমি মাত্র আট দিনের মুসলমান। আমি আর কী পয়গাম দেবো। তবে গত এক মাস আমি ইসলাম সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তা হল, ঈমান রক্ষা করা এবং বৃদ্ধি করার সবচেয়ে সহজ উপায় হল ঈমানকেই অন্যদের নিকট সাফ সাফ পৌঁছে দেয়া।
প্রশ্ন : অনেক অনেক শোকরিয়া! বাস্তবিকই অনেক মূল্যবান কথা বলেছেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লহি ওয়া বারাকাতুহু।
উত্তর : ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, অক্টোবর- ২০০৯