মৌলবী মুহাম্মদ ইউনুস (সুভাষ শংকরলাল)-এর সাক্ষাৎকার

অমুসলিমদের সঙ্গে উত্তম থেকে উত্তমতর আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত দেখা-সাক্ষাত চালু রাখতে হবে। ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তি-সন্দেহ সুন্দর ও মার্জিতভাবে নিরসন করতে হবে। ইসলামের বিধিবিধানগুলো আকর্ষণীয় পন্থায় অমুসলিমদের সামনে তুলে ধরতে হবে। আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবন ও অনুপম আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অনুধাবন করতে হবে, কীভাবে তিনি প্রাণের শত্র“র সঙ্গেও সদ্ব্যবহার করেছেন। ফলে ইসলামের শত্র“রা দলে দলে ইসলামের গন্ডিতে প্রবেশ করেছে। অনুরূপ সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকেও আমরা সবক হাসিল করব ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা কী কী বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়েছিলেন আর আল্লাহ তাআলার ওপর অবিচল আস্থা রেখে কীভাবে সেগুলোর সমাধান করেছিলেন।


আমার বর্তমান নাম মৌলবী মুহাম্মদ ইউনুস। সৌরবর্ষ হিসেবে আমার বয়স প্রায় ৫১ বছর। কিন্তু ইসলামী জীবনে আমার প্রকৃত বয়স ২৮ বছর। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭৮ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনটি আমার জীবনে বিপ্লবের মর্যাদা রাখে যেদিন জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তাআলা আমাকে ঈমান ও হেদায়াতের নেয়ামত দানে ধন্য করেছেন। আমার জন্মতারিখ ৩১ শে জুন ১৯৫৫ ইংরেজী। আমার পৈতৃক নিবাস মহারাষ্ট্রের মান্ডিওয়াল কসবায়। এটা নন্দ গাঁওর নিকটবর্তী মিনমাড় রেলওয়ে জংশনের কাছাকাছি অবস্থিত। জালনার মহারাষ্ট্র নাইট স্কুলে হিন্দি মিডিয়ামে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করি।

১৯৪৭ সালে মেট্রিক পাশ করি। মেট্রিকের পর থেকেই মাথায় বিভিন্ন ধর্মবিষয়ক চিন্তা-ভাবনা ভীড় জমায়। ভাবতে থাকি এর কোনটি সত্য ও সঠিক। হাজারো রকমের প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দিতে থাকে- আমাদের সৃষ্টিকর্তা তো কেউ একজন আছেনই। এই জগৎ সংসারেও তো একজন পালনকর্তা আছে। এসব ভাবতে ভাবতে পূজাপাট থেকে মন উঠে যায়। ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করি। মেট্রিকের পর শুধুমাত্র এই কারণে আমি কলেজে ভর্তি হইনি যে, সেখানে সহশিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। মুসলমানদের সভ্যতায় পর্দার গুরুত্ব দেখে ইসলামের প্রতি আমার ঝোঁক আরও বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে পর্দার গুরুত্ব ও উপকারিতা আমার হৃদয়কে স্পর্শ করে। ইতোমধ্যে জনৈক মাওলানা সাহেবের কতিপয় কিতাবের হিন্দী অনুবাদ আমার হস্তগত হয়। কিতাবগুলো আমাকে খুবই প্রভাবিত করে। আমার এক প্রতিবেশী মুহাম্মদ ইউনুসের আখলাক চরিত্রে আমি আগে থেকেই মুগ্ধ ছিলাম। অধিকাংশ সময়ই তিনি আমাকে ধর্মবিষয়ক কথাবার্তা বলতেন। ইতোমধ্যে আমাদের শহর জালনায় তৎকালীন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি সেহগাল সাহেব আগমন করলেন।

তিনি তখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তার নতুন নাম ছিল ইউসুফ। তিনি মহারাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ তাবলীগী যিম্মাদার মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস রহ.-এর সঙ্গে জালনার ইজতিমায় আগমন করেছিলেন। সেহগাল সাহেব তার বয়ানে বার বার একটি কথার পুনরাবৃত্তি করছিলেন, ভাইয়েরা! আখেরাতের সফর অনেক দীর্ঘ। কাজেই পাথেয় সঙ্গে নিয়ে নাও। কথাটি আমার মনে ধরে যায়। আমার মন আগে থেকেই ইসলামের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ছিল। অপেক্ষা ছিল কেবল আল্লাহর পক্ষ হতে হেদায়াতের পয়গাম আসার। জালনার তিনদিনের ইজতিমায় আমি বিশেষভাবে ঐসব দ্বীনী ভাইদের ভালোবাসা ভ্রাতৃত্ব বোধ এবং উন্নত চরিত্র প্রত্যক্ষ করি। ১৯৭৮ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ই ডিসেম্বর এই তিনটি দিন আমার জীবনে পরিবর্তন আনতে থাকে। অবশেষে ইজতিমায় তৃতীয় দিন ১৬ই ডিসেম্বর আমি আলহামদুলিল্লাহ আমার ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিই।

জালনার মোতি মসজিদে জামাআতের তাশকীল হচ্ছিল। আমিও সেখানে নিজের নাম লিখিয়ে দিই। আমার পুরনো নাম সুভাষ শংকরলাল সাম্বর পরিবর্তন করে মুহাম্মদ ইউনুস রাখা হয়েছিল। এরপর আমি আমার তাবলীগী সফর অব্যাহত রাখি। উর্দু ও আরবী ভাষা একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে শিখতে শুরু করি। আল্লাহর ফজলে এই সফর ‘আলিম’ সনদ লাভের পর শেষ হয়। বুখারী শরীফের মতো হাদীসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কিতাবও আল্লাহ রব্বুল ইযযত পড়ার সৌভাগ্য দান করেছেন। সুভাষ সংকরলাল সাম্বর থেকে মৌলবী মুহাম্মদ ইউনুস পর্যন্ত। এই সফরে বেশ কিছু সমস্যায় জর্জরিত হয়েছি। বহু পরীক্ষারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি কারাগারেও বরকতময় স্মরণীয় কিছু সময় অতিবাহিত করার সুযোগ লাভ হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার সত্তার ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা করায় আমার পা অটল ছিল। সে সময় কুরআনে কারীমের এই আয়াত আমার পথের মশাল হিসেবে কাজ করেছিল।

“হে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা আল্লাহ তাআলা (দ্বীনের) সাহায্য করলে আল্লাহ তাআলাও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের দৃঢ়পদ রাখবেন।” -সূরা মুহাম্মদ : ৭

ঘটনা হল, আয়াতে কারীমা গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে তেলাওয়াত করতে থাকায় আমার সাহস সব সময় বেড়েই চলেছে। আমার আপন বড় ভাই বসন্ত, ছোট ভাই ধনরাজ। আমার মাতা হরকুবাঈ, বোন হীরাবাঈ এখনও বেঁচে আছেন। আল্লাহ তাআলার কাছে মা ও ভাই-বোনের হেদায়েতের জন্য আমি নিয়মিত দুআ করি। ভাইদের সাথে এখনও দেখা-সাক্ষাত হয়। কিন্তু তারা আমাকে দ্বীনে ইসলামের প্রচার-প্রসারে অনুমতি দেয় না। তারা বলে, আপনার যে ধর্ম ভালো লাগে পালন করুন কিন্তু আমাদের ওপর কোনো জবরদস্তি করবেন না। দ্বীন গ্রহণে জবরদস্তি নেই। এই আয়াতের প্রতি লক্ষ করে ধৈর্য্যরে সঙ্গে সামনে এগোচ্ছি। সেই সাথে দুআও করছি আল্লাহ তাআলা তাদেরও হেদায়াতের আলোকে আলোকিত করুন।

আমার স্ত্রী আয়েশাও নওমুসলিমা। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহের দ্বীনের মূলনীতি ও নিয়মকানুনের ওপর সে মজবুতভাবে আমল করছে। আমার ছেলেরা হল হানযালা, হুযাইফা ও আবু বকর আর মেয়ে উম্মে হানী। দুই ছেলে বর্তমানে কুরআনে কারীম হিফয করছে। ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই তারা খতমও করে ফেলবে। আমার আকাক্সক্ষা তারা দ্বীনের উচ্চ থেকে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করুক। দ্বীনের খিদমতে নিজেদের উৎসর্গ করে দিক।
এই হলেন মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস সাহেব যিনি অনুলিখকের সঙ্গে হরম শরীফের ক্লিনিকে সাক্ষাত করতে এসেছিলেন। তিনি ভারতের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, বুযুর্গ হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদবী রহ.-এর মুরীদ মুহাতারাম মাওলানা আবদুল্লাহ হাসানীর নিকট থেকে একটি পরিচিতিমূলক পত্রও সঙ্গে এনেছিলেন। অনুলিখক মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত করে অত্যন্ত খুশি হয়েছে। হরম শরীফে একজন নওমুসলিমের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা, একজন আলেমে দ্বীন হিসেবে তার সঙ্গে পরিচয় এবং অন্যান্য বিষয়াদী জানার পর অধম অনুলিখক খুবই প্রভাবিত হয়েছি।

মৌলভী মুহাম্মদ ইউনুস সাহেবের সেই ইলমী সফর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানা গিয়েছে- ১৯৭৮ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর কয়েকমাস হায়দারাবাদের মাওলানা হামীদুদ্দিন আকেল হুসামীর প্রসিদ্ধ মাদরাসা দারুল উলুম হায়দারাবাদে কাটিয়েছেন। তারপর উত্তর প্রদেশে আজমগড়ের বলরিয়াগঞ্জের জামিআতুল ফালাহ অভিমুখে রওয়ানা হন। এখানেও তিনি কয়েকমাস ইলম অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেন। তারপর ভেলোরে মরহুম জামিল সাহেব প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক সেন্টারে ছয় মাসের কোর্স সমাপ্ত করেন। কোর্সটি বিশেষভাবে নওমুসলিমদের জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছিল। অতঃপর তামিলনাড়–র উমরাবাদে জামিআ দারুল উলুম উমরাবাদে (ঔউঝ অৎধনরপ পড়ষষধমব) পাঁচ বছর কাটিয়েছেন। এখান থেকে ফারেগ হয়ে মুসলিম বিশ্বের প্রসিদ্ধ বিদ্যাপীঠ নদওয়াতুল উলামা লাখনৈ এক বছর সময় ইলম অর্জন করেছেন। এখানে এসে মুফাক্কিরে ইসলাম হযরত মাওলানা আবুল হাসান আল নদভী রহ.-এর সঙ্গেও মোলাকাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। অবশেষে মালিগাঁওয়ের দরগাহ বাইতুল উলুম থেকে শিক্ষা সমাপ্তির সনদ অর্জন করেছেন। দীর্ঘ এই ইলমী সফরে ইলম অর্জনের পাশাপাশি আল্লাহ তাআলার যিকির ফিকিরের সঙ্গেও তিনি লেগে ছিলেন। কবি বলেন,

‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে,
দুঃখ বিনে সুখ লাভ হয় কী মহীতে’

তারপর সুভাষ শংকরলাল সাম্বর একজন আলেমে দ্বীন হয়ে মৌলবী মুহাম্মদ ইউনুস হিসেবে দ্বীনের খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। উপরন্তু আল্লাহর ফজলে আরও পনেরোজন লোকের ইসলামগ্রহণের উপলক্ষ হন।
ইসলামের ছায়াতলে আসার পর আপনি কিভাবে আপনার আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন?

এই প্রশ্নের জবাবে তিনি দ্বীনে ইসলামকে একটি মহামূল্য নেয়ামত ব্যক্ত করে কুরআনে পাকের নিন্মোক্ত আয়াতের উদ্ধৃতি দেন-
“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমি ইসলামকে তোমাদের ধর্মরূপে পছন্দ করলাম।” -সূরা মায়িদা : ৩

মৌলভী মুহাম্মদ ইউনুস বর্তমানে মুসলমানগণ যে সব সমস্যায় নিপতিত রয়েছে সেগুলোর আলোচনা করে বলেন, অবস্থা বাহ্যত কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকবে কিন্তু একাগ্রতা ও দৃঢ়তার মাধ্যমে আমাদের তা মুকাবিলা করতে হবে। আখেরাতের সফলতাকে লক্ষ্য বানিয়ে দুনিয়ার অস্থায়ী লাভÑক্ষতির পরওয়া না করে ধৈর্য, তুষ্টি এবং সহ্যের দ্বারা কাজ নিতে হবে।

মৌলভী সাহেব চলমান সমাজে মুসলমানদের কঠোরভাবে তাওহীদ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, তাওহীদ হল আমাদের ধর্ম ইসলামের মূলভিত্তি ও বুনিয়াদ। এ ব্যাপারে আমাদের সোসাইটির ব্যাপক সংশোধন প্রয়োজন। আকীদা দুরস্ত হলে অন্যান্য বিধিবিধানও উত্তম থেকে উত্তমভাবে পালিত হবে। পক্ষান্তরে তাওহীদ ও আকায়েদে ক্রটি এবং দুর্বলতা থাকলে জীবনের সমস্ত মেহনত পন্ড হওয়ার আশংকা রয়েছে। সুতরাং এই দিকটি নিয়ে আমাদের প্রচুর ফিকির করা দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে অমুসলিমদের মধ্যে কীভাবে দাওয়াতের কাজ চলবে? আলোচনার ফাঁকে এ বিষয়েও তিনি নির্দেশনামূলক কথা বলেছেন। তিনি বলেন, অমুসলিমদের সঙ্গে উত্তম থেকে উত্তমতর আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত দেখা-সাক্ষাত চালু রাখতে হবে। ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তি-সন্দেহ সুন্দর ও মার্জিতভাবে নিরসন করতে হবে। ইসলামের বিধিবিধানগুলো আকর্ষণীয় পন্থায় অমুসলিমদের সামনে তুলে ধরতে হবে। আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবন ও অনুপম আদর্শ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। অনুধাবন করতে হবে, কীভাবে তিনি প্রাণের শত্র“র সঙ্গেও সদ্ব্যবহার করেছেন। ফলে ইসলামের শত্র“রা দলে দলে ইসলামের গন্ডিতে প্রবেশ করেছে। অনুরূপ সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকেও আমরা সবক হাসিল করব ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা কী কী বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়েছিলেন আর আল্লাহ তাআলার ওপর অবিচল আস্থা রেখে কীভাবে সেগুলোর সমাধান করেছিলেন।

মুসলমানদের প্রতি আপনার কী পয়গাম? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি কুরআন কারীমের এই আয়াত তিলওয়াত করলেন-

অর্থ: হে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে দাখেল হও। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিঃসন্দেহে শয়তান তোমাদের সুস্পষ্ট শত্র“। সূরা বাকারা।

তিনি আরও বলেন, এই আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রত্যেককে জীবনের হিসাব মিলিয়ে নিতে হবে। আমরা বাস্তবিকই ইসলামের দিকনির্দেশনার উপর বিশুদ্ধভাবে আমল করছি কি না। না করে থাকলে এটা আমাদের পতিত মানসিকতা ও অনুতাপের জীবন বিবেচিত হবে।

অতঃপর মৌলভী সাহেব গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম একটি বিষয়ে আলোকপাত করেন। বলেন, মানুষ যখন কোনো জিনিসের আকাক্সক্ষী হয়, তার প্রয়োজন পড়ে তখন সেটা লাভ করার জন্য সম্ভাব্য সবরকম চেষ্টা-সাধ্য সে করে থাকে। তখন আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও গায়বী সমর্থনও তার সঙ্গী হয়ে যায়। হযরত বেলাল হাবশা থেকে, হযরত সালমান ফারেসী ইরান থেকে আগমন করে ইসলাম গ্রহণে ধন্য হয়েছেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈকট্যপ্রাপ্ত মর্যাদাবান সাহাবীদের কাতারে শামিল হয়েছেন। আর ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও মর্ম জানা না থাকার কারণে আবু জাহল, আবু লাহাব নবীজীর আত্মীয় হয়েও ইসলাম থেকে বঞ্চিত হল। অনুরূপ হযরত নূহ আ.-এর পুত্র, হযরত লুত আ.-এর স্ত্রী, হযরত ইবরাহীম আ.-এর পিতাকে দেখুন তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার হেদায়েতের পথ অনুকূল হয়নি। ব্যাপারটি বড়ই শিক্ষণীয়। কাজেই সব কথার সারকথা হল, ইসলামের জন্য, সত্যের জন্য আগ্রহ ও মর্মজ্বালা থাকতে হয়। ঈমানের প্রকৃত উষ্ণতা ও স্বাদ যেন আমাদের নসীব হয়। কবি বলেন-
‘যুবাঁ ছে কাহ্ভী দিয়া লা ইলাহা তো কিয়া হাসিল
দিল ও নেগাহ মুসলমান নেহী তো কুছভী নেহী’

ভাবার্থ- মুখে মুখে যতই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু জপো দিল; আর দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমান না হলে কোনো লাভ নেই।
মৌলভী মুহাম্মদ ইউনুস সাহেবের জিদ্দা থেকে সানআ হয়ে মুম্বাইয়ের ফ্লাইট ছিল। অনুলিখক তাঁকে জিদ্দার বিমান বন্দর টার্মিনালে আল বিদা জানাচ্ছিল আর দৃষ্টিতে ভেসে উঠছিল সূরা বাকারার এই আয়াতÑ আল্লাহ তায়ালার বিধিবিধান আঁকড়ে ধরা অত্যন্ত জরুরী। অন্যথায় আল্লাহ তাআলার গযব থেকে আমাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন-
“আর তাদের উপর আরোপ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষাণলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহর বিধিবিধান মানতো না।” -সূরা বাকারা : ৬১

আল্লাহ তাআলা আমাদের মধ্যে ইসলামের সত্যিকার দরদ ও আকাঙ্খা সৃষ্টি করে দিন। ইসলাম গ্রহণের এই ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষা গ্রহণ করি, আমাদের এই জীবন আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত এক আমানত। এর প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। জীবনের মুহূর্তগুলো কায়েনাতের খালিক ও মালিকের পায়গাম তার মাখলুককে পৌঁছে দেয়ার কাজে লাগলে তবেই জীবন সার্থক। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন। তার বিধিবিধানের প্রতি অনুগত করে দিন।


সৌজন্যে : মাসিক আরগুমান, নভেম্বর : ২০০৭ ইং