শামীম ভাই (শিয়াম চন্দ্র)-এর সাক্ষাৎকার

আমি তাদের উদ্দেশ্যে কী বলতে পারি? বলার মতো মুখ তো আমার নেই। তবে হযরতের কাছে যে কথা বারবার শুনে আসছি সে কথাই বলবো। আমাদের মুসলমানগণ যেন নিজেদের দা‘য়ী মনে করেন। পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে যেন তারা দাওয়াতের ক্ষেত্র মনে করেন। তারা যদি এমনটি করতে পারেন তাহলে আমাদের এ পৃথিবী বেহেশতে পরিণত হবে। একজন দা‘য়ী একজন চিকিৎসক। যাকে দাওয়াত দেয়া হয় সে তো অসুস্থ। অসুস্থের বেলায় কোনো চিকিৎসক নিরাশ হতে পারেন না। তাছাড়া কোনো চিকিৎসক রোগীকে ঘৃণা করতে পারে না। ধাক্কা দিয়ে ফিরিয়ে দিতে পারে না। বেদনার বিষয় হলো, মুসলমানগণ এই রোগীদের প্রতিপক্ষ ভেবে বসেছেন। এর নির্মম পরিণতির শিকার আজ মুসলমানরাও। এ কারণেই আজ পৃথিবী ঈমান ও ইসলাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
শামীম ভাই: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: শামীম ভাই! জামাত থেকে কবে এলেন?
শামীম ভাই: আমি ২২ এপ্রিলই ফিরে এসেছিলাম।

আহমদ আওয়াহ: আপনার চিল্লা কোথায় এবং কেমন কাটলো?
শামীম ভাই: আমার এ চিল্লা মেওয়াতে কেটেছে। বিজনুরের একটি জামাত ছিল। জামাতের আমীর ছিলেন মুফতী আব্বাস সাহেব। আলহামদুলিল্লাহ! পূর্বের জামাত থেকে এ চিল্লা ভালো কেটেছে।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ : এটা তো আপনার দ্বিতীয় চিল্লা?
শামীম ভাই: হ্যাঁ ভাই আহমদ! প্রথম চিল্লা আমি মাওলানা সাহেব হজ্জ থেকে ফেরার পর গিয়েছিলাম। হজ্জ থেকে আসার চার দিন পরেই আমি কালেমা পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিরাম। তার তিন দিন পর কাগজপত্র তৈরি করে আমাকে নিযামুদ্দীন মারকাযে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেখান থেকে আমাকে এক চিল্লায় জামাতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সে চিল্লাটি কেটেছিল সীতাপুরে। তবে সেই জামাতটা অনেকটা আমার মতই ছিল। মন্দ বলবো না। বরং বলবো, আমার মতোই জামাতের আমীর সাহেব নতুন ছিলেন। ফলে প্রতিদিনই সঙ্গীদের মধ্যে পরস্পরে ঝগড়া বিবাদ হতো। আমাদের চারজন সাথী চিল্লা শেষ না করেই ফিরে এসেছিল। আমি মনে করি এটা আমার কারণেই হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মাফ করুন আমি আমার মতো সঙ্গীদেরই মুখোমুখি হয়েছিলাম!

আহমদ আওয়াহ: শামীম ভাই! এবার আপনি আপনার বংশ পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলুন।
শামীম ভাই: মুজাফফরনগর জেলার সখিরা গ্রামে আমার জন্ম। আমি জন্মেছি ১৯ এপ্রিল ১৯৮৪ সালে এক জমিদার পরিবারে। পিতাজী আমার নাম রেখেছিলেন শ্যামচন্দ্র। আমার বংশ এমনিতেই শিক্ষিত। আমার চাচা সরকারী অফিসার। পিতা ছিলেন স্কুলের হেড মাস্টার। তার সহায়-সম্পদ কম ছিল না। সত্তর বিঘা জমি। আমার বড় ভাই আর্মি। একমাত্র বোন, তার বিয়ে হয়ে গেছে। তার স্বামী একজন স্কুল শিক্ষক। আমার লেখাপড়া হাই স্কুল পর্যন্ত হয়েছিল। তারপর লেখাপড়া ছেড়ে সিনেমা দেখা, সিগারেট খাওয়া, বাউন্ডলে ছেলেদের সাথে ঘুরে বেড়ানোই আমার একমাত্র নেশা হয়ে দাঁড়ায়। আমার পিতা আমাকে পড়াশোনার প্রতি প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করেন। ফলে আমি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাই। আমার বন্ধুরা ভালো ছিল না। যার কারণে আমি সবসময় নেশা করে বেড়াতাম।

দীর্ঘদিন পর ঘরে ফিরি। আমি তখন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছি। খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে সম্পূর্ণ ওদের মতোই হয়ে গেছি। আমার পরিবার আমাকে খরচের পয়সা দিত না। অথচ তখন আমার খরচের পরিমাণ অনেক। ফলে বাধ্য হয়ে ঘর থেকে চুরি করতে হতো। আমার চুরির বিষয়টি যখন পরিবারের লোকেরা টের পায় তখন তারা সতর্ক হয়ে যায়। আর আমাকেও তখন ঘরের বাইরে চুরিধারিতে হাত দিতে হয়। বিষয়টা ধীরেধীরে মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। অবশেষে আমি লুটেরা ও ছিনতাইকারী গ্যাংদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ি। আল্লাহ তায়ালার দয়া ও করুণার উপর আমার জীবন উৎসর্গিত হোক। অবশেষে এই গ্যাংই আমার জীবনে হেদায়েতের আলো বয়ে আনে।

আহমদ আওয়াহ: সাধারণত গ্যাংদের সাথে যারা মেশে তাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। এটা আপনার প্রতি আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ, তাঁর রহমত আপনাকে নর্দমার আবর্জনা থেকে তুলে তাঁর রহমতের কোলে ঠাঁই দিয়েছে।
শামীম ভাই: হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। আসলে আমার বংশ এবং আমার পরিবার খুবই ভদ্র শ্রেণীর। আমার পরিবারের প্রায় সবারই সম্পর্ক মুসলমানদের সাথে। আমাদের ছোটবেলাটাও কেটেছে মুসলমানদের সাথে। আমার দুর্ভাগ্য। ধীরে ধীরে আমি সেই পরিবেশ থেকে দূরে সরে পড়ি। কিন্তু এই মন্দ পরিবেশে গিয়েও আমি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারিনি। স্বভাবগতভাবেই কেমন যেন একটা দূরত্ব বরাবরই আমি অনুভব করেছি।

আহমদ আওয়াহ: আচ্ছা, আপনার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি শোনাবেন কি?
শামীম ভাই: ভাই আহমদ! গত বছরের ঘটনা। দুখিয়ারীতে আপনার আব্বাজানের একটা মাহফিল ছিল। তিনি সেখান থেকে মনসুরপুর হয়ে ঘুরে ফিরছিলেন। কিছু বদমাশ খুনি তার গাড়ির উপর হামলা করে এবং গুলি চালায়। গাড়ির ড্রাইভার সলিম মিয়ার গায়ে দুটি গুলি লেগেছিল। একটি গুলি হাতের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। আরেকটি লেগেছিল একেবারে হার্ট বরাবর বুকের উপর। গুলির আঘাতে তার জামাটি বিশ্রীভাবে ফেটে গিয়েছিল। ৩১৫ নম্বর গুলি। আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ গুলি বাহু ছুঁয়ে চলে গেছে। গুলির চি‎‎হ্ন যেই দেখতো সেই আশ্চর্য হতো। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদের নিজ কুদরতে এভাবেই হেফাযত করেন। এটা ছিল তারই নিদর্শন। গুলি লাগা সত্ত্বেও ড্রাইভার সলিম মিয়া দুই তিন কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ি পেছনে টেনে নিয়ে যায়। তারপর সুযোগ বুঝে বাঁক নেয়। অন্তত দশ মাইল পথ অতিক্রম করার পর তার গুলি খাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতো ভয়াবহভাবে গুলি লাগার পরও সে সাহস হারায়নি। আমার সঙ্গীরা বলেছেÑ আমরা খুব সতর্কতার সাথে নিশানা ঠিক করে গুলি ছুঁড়ে ছিলাম। বিশ্বাস ছিলÑ ড্রাইভার অবশ্যই মারা গেছে।

যারা এই গাড়িতে হামলা করেছিল তারা সকলেই আমার বন্ধু ছিল। আমার প্রতি আমার মালিকের অসীম কৃপা আমি দুই সপ্তাহ আগে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। মুজাফফরনগর হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। বনের আগুনের মতো এই দুর্ঘটনার সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ছিল আট। তাদের মধ্যে আমিই কেবল হিন্দু। অবশিষ্ট সকলেই মুসলমান। মজার বিষয় হলো, সেদিন আমি ছাড়া বাকি সকলেই অপারেশনে শরীক ছিল। ঘটনা ঘটার পর খাতুলি থানা কোতোয়ালীও সিআইডি ইনচার্জকে ডেকে পাঠায় এবং কোতোয়ালী ও সিআইডি মিলে এই মর্মে শপথ করে বসে, আমাদের এলাকায় এমন একজন সজ্জনের উপর হামলা হয়েছে, আমাদের লজ্জায় মরে যাওয়া উচিত।

আমরা শপথ করছি, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই অপরাধীদের খুঁজে বের না করবো ততক্ষণ পর্যন্ত খাবার খাবো না। তাছাড়া এমন একজন ভালো মানুষের উপর যারা গুলি চালায় তারা রেহাই পাবে কী করে। দেখা গেলো তৃতীয় দিনেই তাদের মধ্যে তিনজন ধরা পড়ে গেল। তাদের যখন চাপ দেয়া হলো, মারধর করা হলো, তখন তারা অন্য সকলের নাম বলে দিল। সপ্তাহ পার হবার আগেই অবশিষ্ট চারজন গ্রেফতার হয়ে গেল। তাদের নামে আগে থেকেই থানায় লুট, ছিনতাই, চুরিসহ নানা অভিযোগের অনেকগুলো মামলা ছিল। থানা ইনচার্জ এদের বিরুদ্ধে এমন কেইস তৈরি করলো যাতে জামিনের অবকাশ নেই।

এক সপ্তাহ পর আমার শরীর কিছুটা সেরে উঠলো। এর মধ্যে দুই বার আমার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর দুই সপ্তাহ বাড়িতে কাটালাম। আমার সঙ্গীরা গ্রেফতার হয়েছে এ কথা আমি আগেই জেনেছি। ভয়ে আমার সমস্ত শরীর শুকিয়ে যাচ্ছিল। তারা আমার নাম বলে দেয় কিনা। কিন্তু দুই মাস পরও যখন দেখলাম পুলিশ আসলো না তখন কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। এদিকে সুযোগ করে আমি একদিন তাদের সাথে জেলখানায় সাক্ষাত করতে গেলাম। সাক্ষাতের পর তারা আমাকে বিস্তারিত ঘটনা শোনালো। তারপর আমাকে এই বলে অভিশাপ দিল যে, অসুস্থ ছিলে বলে এ যাত্রায় বেঁচে গেলে নইলে এখন জেলখানায় থাকতে হতো।

মুজাফফরনগর জেলখানায় আমার বন্ধুদের এমন কিছু ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয় যাঁরা মাওলানা কালিম সিদ্দিকীকে জানতেন। এদের শত্র“তা করে মিথ্যা হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছিল। হযরত মাওলানা এবং তাঁর সঙ্গীদের প্রচেষ্টায় তারা মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। মাওলানা নিজে কয়েকবার জেলখানায় গিয়ে তাদের সাথে দেখাও করেছেন। তারা জেলখানায় বসে মাওলানা এবং তাঁর পরিবারের নানা ঘটনা শোনাতো। তারা বলতো, মাওলানা সাহেব এতোটাই সজ্জন, তিনি নিজে তার ঘরে যারা চুরি করে তাদের ছাড়িয়ে আনেন। তাদের মাফ করে দেন। তাদের ঘরে রেশন পৌঁছে দেন।
কুঁকড়াগাওয়ের এক বন্ধু ছিল আমাদের। সেই ছিল মূলত এই গ্যাংয়ের প্রধান। আমি যখন জেলখানায় গিয়ে তার সাথে সাক্ষাত করলাম তখন সে আমাকে বলেছিল, তুমি ফুলাত যাবে। মাওলানার কাছে গিয়ে আমার দূরাবস্থার কথা বলবে। ইনিয়ে-বিনিয়ে কান্নার ভান করে হলেও আমাদের পেরেশানির কথা তাঁকে অবশ্যই বলবে। আমি বললাম, তোমাদের কি সামান্যতম লজ্জাবোধ নেই? যার উপর তোমরা গুলি চালিয়েছ তার সামনে গিয়ে মুখ দেখাবো কীভাবে? কিন্তু সে আমাকে বারবার চাপ দিচ্ছিলো। বলছিল তুমি একবার গিয়ে দেখ, তিনি কী আচরণ করেন? তাকে তুমি গিয়ে বলবে, আমার সঙ্গীরা সকলেই অন্তর থেকে ক্ষমা চাচ্ছে। তারা ওয়াদা করছে, এবার জেল থেকে বেরুবার পর ভালো হয়ে যাবে। আপনার কাছে মুরীদ হবে। আমার কোনভাবেই সাহস হচ্ছিলো না।

এভাবে প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেল। তাদের চাপাচাপিতে এক সময় আমার ভেতরও করুণার উদ্রেক হয়। আমি ঠিকানা সংগ্রহ করে ফুলাত চলে যাই। তখন ছিল শীতকাল। বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি ভিজে গিয়েছিলাম। হযরত তখন যোহর নামায পড়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়েছেন আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন। কোত্থেকে এসেছো? আমি আমার গ্রামের নাম ও ঠিকানা বললাম। মাওলানা ঘরে গিয়ে আমার জন্য একটি শার্ট-প্যান্ট নিয়ে এলেন। বললেন, বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়েছে তুমি ভেতরে গিয়ে কাপড় বদলে নাও। আমার নাম জিজ্ঞেস করলে বললাম শ্যামচন্দ্র। তিনি আমাকে বারান্দায় বসতে বললেন। ভেতর থেকে এক বাচ্চাকে চা দিতে বললেন। তারপর মসজিদের দিকে যেতে যেতে বললেন, তুমি এমন এক এলাকার অতিথি যেখানে আমাদের খুব আপ্যায়ন করা হয়েছিল। আমাদের ড্রাইভারের গায়ে গুলি লেগেছিল। তার এ কথা শুনে আমি কুঁচকে গেলাম। আমার এ কুঞ্চিতভাব দেখে মাওলানা সাথে সাথে বললেন, তুমি লজ্জা পাচ্ছ কেন? তুমি তো আর গুলি করোনি! তুমি আমাদের মেহমান। তারপর তিনি মসজিদে চলে গেলেন। মসজিদ থেকে ফিরে আসার পর আমি তাকে বললাম, আপনার সাথে একান্তে কিছু কথা বলার আছে। আমি যেখানে বসা ছিলাম তার বরাবর ছোট একটি কক্ষে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন। ভেতরে যাওয়ার পর আমি আমার পরিচয় দিলাম। আমার বন্ধুদের অবস্থা সবিস্তারে তুলে ধরলাম। যতটা সম্ভব সত্যমিথ্যা দিয়ে তাদের অবস্থা বললাম। এ-ও বললাম আপনি চাইলেই এরা জামিন পেতে পারে।

মাওলানা সাহেব বললেন, প্রথম কথা হলো আমরা এদের গ্রেফতার করাইনি। তাছাড়া এরা যতটা না অপরাধী তারচে’ বেশি অসুস্থ। এমন শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসারী তাছাড়া জগতের শ্রেষ্ঠ দয়ালু নবীর প্রতি যাদের ঈমান তারা যদি এমন নির্বিঘেœ মানুষের প্রাণ ছিনিয়ে নেয় তাহলে পৃথিবীর অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তুমি তাদের গিয়ে বলো, তাদের চিকিৎসা হলো হয়তো সারাজীবন জেলখানায় কাটাবে অথবা তিন চিল্লার জন্য জামাতে বের হয়ে যাবে। তারা যদি আন্তরিকভাবেই কৃত অপরাধের জন্য লজ্জিত বোধ করে তাহেল যেন সোজা তিন চিল্লার জন্য বেরিয়ে যায়। আমি তাদের বিরুদ্ধে তখন সাক্ষী না দিয়ে তাদের জামিনের চেষ্টা করবো। মাওলানা সাহেব আমাকে খাওয়া-দাওয়ার কথা বললেন। এক ভদ্রলোক ভেতর থেকে খাবার নিয়ে এল। কিছুক্ষণ পর মাওলানা ফিরে এলেন। আমাকে বললেন, তুমি তোমার বন্ধুদের জেল জীবনের কথা খুব ভাবছো। অথচ মৃত্যুর পর তোমাকেও একটি জেলখানার মুখোমুখি হতে হবে। সেই জেলখানা থেকে জামিনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সে এক চিরন্তন জেলখানা তার নাম নরক। সেখানে যেসব শাস্তি রয়েছে আমাদের পুলিশ বাহিনীর পক্ষে তা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। একথা বলে তিনি আমার হাতে ‘আপকি আমানত’ পুস্তিকাটি তুলে দেন। তারপর আমার সাথে কথা বলার জন্য এক ব্যক্তিকে ডেকে পাঠান। আর তিনি চলে যান।

সেই লোক আমাকে মুসলমান হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আমাকে সে বলে, তুমি খুবই ভাগ্যবান। সৃষ্টিকর্তা এক উসিলায় তোমাকে হযরতের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে আমি তার সাথে অঙ্গীকার করি পুস্তিকাটি আমি পড়বো। তারপর আমি এই ভেবে খুশি মনে ঘরে ফিরে আসি যে, চার মাসের জন্য জামাতে যাওয়া কোনো কঠিন ব্যাপার নয়।

পরের দিন আমি জেলখানায় যাই। তাদের সুসংবাদ দিই। তারা আমার কথা শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং বলে, আমরা এমন একজন ভালো মানুষের উপর হামলা করেছিলাম? তারপর তারা সেই নওমুসলিম বন্দীদের সাথে থাকতে শুরু করে। নিয়মিত নামায পড়তে থাকে। নিয়মিত তালিমে বসতে থাকে, তাদের কথায় আরও তিনজন অমুসলিম এরই মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় দিন আমি পুস্তিকাটি নিয়ে বসি। আমার মতো একজন অপরিচিত মানুষের সাথে তিনি যে আচরণ করেছেন সে কারণে আমি ভেতরে ভেতরে তার প্রতি পরম অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলাম। পুস্তিকাটি পড়ার পর আমার আবেগ আরও বেড়ে গেল।

তিনদিন পর আমি আবার ফুলাত যাই। কিন্তু তাকে সেখানে পাইনি। খুবই হতাশ মনে ঘরে ফিরে আসি। তৃতীয়বার গিয়ে শুনি তিনি এসেছিলেন এবং আজই হজ্জের সফরে গেছেন। অন্তত এক মাস পর ফিরবেন। আমি একটি একটি করে দিন গুণতে থাকি। ভাই আহমদ! আমি ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না সেই মাসটি আমি কিভাবে পার করেছি। মনে হয়েছে মাস তো নয় যেন দীর্ঘদিন ধরে আমি বন্দী অবস্থায় আছি। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ আমি ফুলাতে ফোন করে জানতে পারলাম হযরত হজ্জ থেকে ফিরেছেন। আগামীকাল পর্যন্ত বাড়িতেই থাকবেন। ১৬ জানুয়ারী সকাল দশটায় আমি তার খিদমতে হাজির হই এবং কালেমা পড়ি।

আমি হযরতকে বললাম, আমার পিতাজী আমাকে মারতেন এবং এই বলে শাসাতেন, হতভাগা! আমাদের পূর্বপুরুষরা তো বলতেন, মানুষ তো সেই যার দ্বারা শত্র“রও উপকার হয়। অথচ তুমি তোমার ঘরকে নরকে পরিণত করেছ। আমি তখন বলতাম, এমন লোক অন্য জগতে হয় এই জগতে নয়। অথচ দেখুন! আপনাকে যারা গুলি করতে চেয়েছে তারাই আমার ঈমানের উপলক্ষ হয়েছে। মাওলানা বললেন, এখানে আমার হাত নেই। যে মালিক তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমার প্রতি তাঁর করুণা জেগেছে। তোমার কর্তব্য হবে সেই করুণার মূল্য দেয়া। তারপর তিনি আমার নাম রাখলেন শামীম আহমদ।

আহমদ আওয়াহ: তারপর আপনি জামাতে চলে গেলেন?
শামীম ভাই: ইসলাম গ্রহণের পরেরদিন কাগজপত্র করার জন্য আমাকে মিরাঠে পাঠালেন। কাগজপত্র তৈরী হয়ে গেলে হযরত নিজে আমাকে নিয়ে দিল্লী গেলেন। তারপর অন্য একজন মাওলানার সাথে আমাকে মারকাযে পাঠালেন। সীতাপুরে আমি এক চিল্লা কাটালাম। সামান্য নামায ইত্যাদি শিখতে পেরেছিলাম। ফিরে এসে কিভাবে চিল্লা কাটালাম কী শিখলাম মাওলানা সাহেবকে জানালাম। সব শুনে তিনি বললেন, চল্লিশ দিনে যদি তুমি অন্তত ভালো করে কালেমাটা শিখতে তাও যথেষ্ট ছিল, অথচ তুমি তো নামাযও মোটামুটি শিখে ফেলেছ। আরেক চিল্লায় গিয়ে ভালো করে শিখে নেবে। কিছুদিন আমি মুজাফফর নগরের একটি মাদ্রাসায় থাকলাম। তারপর আবার চিল্লায় গেলাম।
আলহামদুলিল্লাহ! এবার বেশ উপকার হয়েছে। একপারা কুরআন শরীফ পড়েছি। উর্দূটাও মোটামুটি শিখেছি। পরিবার এবং বন্ধুদের জন্য দুআ করেছি। তারপর জেলখানায় ফিরে গিয়ে যখন বন্ধুদের পুরো কাহিনী জানিয়েছি তখন তারা খুব খুশি হয়েছে। এরইমধ্যে দুজন জামিন পেয়েছে। আমি তাদের তৈরি করে তুলেছি তারা সাতজনই চার মাসের জন্য জামাতে বের হবে।

আহমদ আওয়াহ: জামাত থেকে আসার পর কি আপনি বাড়িতে গেছেন? পরিবারের লোকেরা আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছে?
শামীম ভাই: আমার পরিবারের লোকেরা ভেবেছিল আমি আবার খুনিদের সাথে কোথাও বেরিয়ে গেছি। আমি সবসময় এরকম না বলেই বেরিয়ে যেতাম ঐসব জায়গায়। কিন্তু আমি যখন মাথায় টুপি দিয়ে গায়ে পাজামা-পাঞ্জাবী পরে বাড়ি গিয়ে উঠেছি তখন তারা কিছুটা আশ্চর্যই হয়েছে। প্রথম দিকে আমার পিতাজী খুবই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তারপর আমি যখন তাকে ফুলাতে আসা এবং সেখানকার পুরো বৃত্তান্ত বলে শোনালাম, তখন তিনি চুপ হয়ে গেলেন।

একদিন আমি তাকে নানাভাবে অনুনয় বিনয় করে কিছু সময়ের জন্য প্রস্তুত করি। অন্তত দুই ঘন্টা তার সাথে দাওয়াতি কথাবার্তা বলি। তারপর ‘আপকি আমানত’ পুস্তিকাটি তার হাতে তুলে দিই। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরও ঘুরিয়ে দিয়েছেন। পরে ফুলাতে গিয়ে মুসলমান হয়েছেন। আমাদের গ্রামে মুসলমানের সংখ্যা নামে মাত্র। মাওলানা এখন আমাদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। আমার বাবা এখন পরিবারের লোকদের বুঝাবার চেষ্টা করছেন। দুআ করি আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের পুরো পরিবারকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দান করেন। আমিন।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! খুবই চমৎকার। আল্লাহ তায়ালা সবকিছুতেই বরকত এবং কল্যাণ দান করুন। আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো পয়গাম?
শামীম ভাই: আমি তাদের উদ্দেশ্যে কী বলতে পারি? বলার মতো মুখ তো আমার নেই। তবে হযরতের কাছে যে কথা বারবার শুনে আসছি সে কথাই বলবো। আমাদের মুসলমানগণ যেন নিজেদের দা‘য়ী মনে করেন। পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে যেন তারা দাওয়াতের ক্ষেত্র মনে করেন। তারা যদি এমনটি করতে পারেন তাহলে আমাদের এ পৃথিবী বেহেশতে পরিণত হবে। একজন দা‘য়ী একজন চিকিৎসক। যাকে দাওয়াত দেয়া হয় সে তো অসুস্থ। অসুস্থের বেলায় কোনো চিকিৎসক নিরাশ হতে পারেন না। তাছাড়া কোনো চিকিৎসক রোগীকে ঘৃণা করতে পারে না। ধাক্কা দিয়ে ফিরিয়ে দিতে পারে না। বেদনার বিষয় হলো, মুসলমানগণ এই রোগীদের প্রতিপক্ষ ভেবে বসেছেন। এর নির্মম পরিণতির শিকার আজ মুসলমানরাও। এ কারণেই আজ পৃথিবী ঈমান ও ইসলাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! মাশাআল্লাহ শামিম ভাই! খুবই চমৎকার পয়গাম দিলেন। আমি দীর্ঘদিন ধরে এ জাতীয় সাক্ষাৎকার নিচ্ছি। আপনার মতো এমন চমৎকার কথা খুব কমই শুনেছি। এই উপলব্ধির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
শামীম ভাই: ভাই আহমদ ! এটা আমার কথা কোথায়? কথাটা হযরতের। আমি মুখস্ত করে শুনিয়ে দিয়েছি মাত্র।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অনেক ধ্যন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
শামীম ভাই: আপনাকেও ধন্যবাদ। ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, জুন ২০০৭