শোকর আদায়ের অভ্যাস করুন

নিরাপত্তার খোঁজ :
প্রতিটি মানুষ, চাই সে যে কোনো দেশের অধিবাসী হোক আর যে কোনো ধর্মের অনুসারী হোক না কেন, সকলেই চায় নিরাপত্তা। প্রত্যেকের মনে এই আগ্রহ জন্মে যে, সে সকল প্রকার বালা মুসিবত আর দুঃশ্চিন্তা থেকে বেঁচে থাকতে ইসলামধর্ম যা স্বভাবজাত ধর্ম। যেই ধর্মে মানুষের সভাবগত চাহিদা গুলোর খুব খেয়াল রাখা হয়েছে। এর মধ্যেও নিরাপত্তা প্রশংসিত এমনকি কাম্য।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হযরত আব্বাস রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে বিশেষ কোনো দুআ শিখিয়ে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি উত্তরে এটাই বললেন, আপনি আল্লাহর কাছে আপনার নিরাপত্তা কামনা করুন।
এই দোয়ার শব্দগুলো আবু দাউদ সহ অন্যান্য হাদিসের কিতাবগুলোতে এরকম এসেছে।
اللهم اني اسئلكك العفو والعافية في الدنياو الأخرة ِ
হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা কামনা করছি।
এ থেকে বুঝা যায়, ইসলাম মানুষের প্রকৃত চাহিদা এবং প্রয়োজনের প্রতি দৃষ্টি রেখে, ক্ষমা ও মুক্তি কামনা করার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যথায় নিজেকে অনর্থক কষ্ট মুসিবত ও দুঃখ দুশ্চিন্তায় লিপ্ত হওয়াকে প্রতিহত করেছে।
সমস্যা ও জটিলতা দুই প্রকার
প্রথম প্রকার: ঐ সব দুশ্চিন্তা ও সমস্যা, যা মানুষের সামনে সম্মুখীন হয়। যে গুলো মানুষের সভাবের বিপরিত। এগুলো আবার দুই প্রকার। এক প্রকার তো হলো ঐ পেরেশানী, কষ্ট-ক্লেশ, যার বিনিময় পাওয়া যায়। বা যার প্রতিদান পাওয়ার আশা আকাঙ্খা থাকে।
এ ধরনের কষ্ট ক্লেশ, ও দুশ্চিন্তায় মানুষ পেরেশান হয় না। কষ্টকেও কষ্ট মনে করে না। এমতবস্থায় মানুষের শারীরিক ভাবে কষ্ট পেলেও মানষিক ভাবে এটাকে কষ্ট মনে করে না। বরং প্রতিদান বা লাভ পাওয়ার আশায় এই কষ্টের মধ্যেও এক ধরনের স্বাদ, তৃপ্তি রয়েছে।
বিভিন্ন চাকরি জীবীদেরকে অনেক সময় অফিস বা ফ্যাক্টরীতে কাজ বেশি থাকার কারণে অতিরিক্ত সময় দিতে হয়। ওভার টাইম নামে তারা কাজ করে ঐ সময় বেতন দ্বিগুন করে দেওয়া হয়। পুরোদিনের ক্লান্তি থাকা সত্বেও শ্রমিকরা আনন্দের সাথে সময় পার করে দেয়।
একজন কৃষক শীতকাল বা কঠিন গরমের সময়ও ভালো উৎপাদনের আশায় কঠিন পরিশ্রম করে। কঠিন এই পরিশ্রমের ও কষ্টের কথা কখনো প্রকাশ করে না।
বিশেষ কোনো উৎসবের পূর্বে ব্যবসায়ীদের এধরনের পরিস্থিতির মুকাবেলা করতে হয়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সকাল সকাল দোকান খুলতে হয়। বাসায় চা নাস্তা খাওয়ারও সুযোগ থাকে না।
কারণ গ্রাহকরা চলে আসবে। দোকানে ক্রেতাদের লাইন লেগে যাবে। সকাল থেকে বিকাল, বিকাল থেকে রাত দোকানে এতো ভিড়, খাবার দাবার তো দূরের কথা একটু কোমর সোজা করে বসারও সুযোগ পায় না। তার এই ব্যস্ততা দেখে যদি কোনো বুদ্ধিমান মানুষ তার প্রতি মায়া করে তাকে বলে; ভাই আপনার খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগামী কাল সকালে আগত প্রত্যেক গ্রাহককে অন্য দোকানে পাঠিয়ে দিব। তাহলে আপনি একটু বিশ্রাম নিতে পারবেন। এটাই বাস্তব কোনো বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী তার এই পরামর্শকে ভ্রুক্ষেপই করবে না। শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী এই হাড় ভাঙ্গা মেহনত ও শ্রমকে প্রশান্তি ও আনন্দের সাথে সহ্য করে যাচ্ছে। কারণ এই পরিশ্রমের বিনিময়ে পাবে দ্বিগুণ বেতন, অধিক উৎপাদন ও অনেক মুনাফা।
সমস্যা ও জটিলতার দ্বিতীয় প্রকার
দ্বিতীয় প্রকার সমস্যা ও জটিলতা হলো, ঐ সমস্ত কষ্ট ও পরিশ্রম, যা মানুষের জন্য শাস্তি স¦রূপ এবং যেই কষ্টের পর ভবিষ্যতে কোনো প্রকার বিনিময়ের আশাও নেই। এধরণের কষ্টকে শরিয়তের পরিভাষায় আজাব বলা হয়।
এধরনের মসিবত কষ্ট ও পেরেশানী মানুষকে আত্বিক ও মানসিক ভাবে কষ্ট দেয়, যেগুলো আজাব হিসাবে উপস্থিত হয়। এই জন্য এসব পেরেশানী ও দুশ্চিন্তা এবং কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য মানুষ নাজাত ও মুক্তি কামনা করে।

পেরেশানী থেকে মুক্তির উপাই
এই আজাব ও শাস্তি থেকে মুক্তিলাভের জন্য কুরআনে কারীমের একটি সহজ উপায় বলা হয়েছে। খুবই প্রিয় ভঙ্গিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বান্দাদেরকে এই আজাব থেকে মুক্তির পদ্ধতি বলে দিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন-
مَا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِنْ شَكَرْتُمْ وَآَمَنْتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا .
অর্থ. তোমরা যদি ঈমান আন এবং শুকরিয়া আদায় কর তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি আজাব দিয়ে কী করবেন। আল্লাহ তাআলা শাকের এবং প্রজ্ঞাময়।
কত সুন্দর ও প্রিয় ভঙ্গীতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে কী করবেন। অর্থাৎ শাস্তির তো প্রশ্নই আসে না। যদি তোমরা ঈমানের সহিত শুকরিয়া আদায় কর। আল্লাহ তাআলা মূল্যায়ন কারী ও প্রজ্ঞাময়। ঈমান হলো প্রতিটি আমলের জন্য অবিচ্ছিন্ন শর্ত। ঈমানের সাথে শুকরিয়া আদায়কারীদেরকে আল্লাহ তাআলা কখনো শাস্তি বা আজাব দিবেন না। বরং আজাব থেকে বাঁচার একটি খুব সহজ উপায়। যে, মানুষ যেন কৃতজ্ঞ ও শুকরিয়াগুজার হয়ে যায়।
কিন্তু মানুষ অকৃতজ্ঞ হিসাবে প্রমানিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী দ্বারাও এ কথা বুঝা যায়। আল্লাহ তাআলা যখন তার কোনো বান্দাকে কোনো মসিবত দেন, সেই বান্দা যদি ধৈর্য ধারণ করে। আল্লাহ তাআলা ফেরেস্তাদেরকে নির্দেশ দেন, আমার বান্দার মসিবতের কারণে তার প্রতিদান বাড়িয়ে দাও। আর তার মসিবতকে প্রশান্তি দ্বারা পরিবর্তন করে দাও।
এর বিপরীত বান্দা যখন কোনো বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ না করে, আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করা ছাড়া মানুষের সামনে অভিযোগ করে, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেস্তাদেরকে নির্র্দেশ দেন যে, তার মসিবতের জন্য যে প্রতিদান আছে, তা শেষ করে দাও। আর তার কষ্ট আরোও বাড়িয়ে দাও। এতদসত্ত্বেও মানুষ অল্প একটু কষ্ট পেলে বা সমস্যা হলেই মানুষের কাছে অভিযোগ করতে থাকে। বরং আল্লাহ তাআলা ছাড়া বান্দাদের সামনে নিজের অস্থিরতার কথা বলা নিতান্তই অনর্থক। বরং মানুষ যখন আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য মানুষের কাছে তার সমস্যার কাথা বলতে থাকে , তখন মানুষ তার থেকে দূরে সরতে থাকে।
নেয়ামতের অনুভূতিটুকু পর্যন্ত নেই
মানুষের অবস্থা হলো রাতে এমনকি প্রতিটি মুহুর্তে তার উপর লক্ষ কোটি বরং অসংখ্য নেয়ামত বৃষ্টির মতো বর্ষিত হয়, এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন- . وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ اللَّهَ لَغَفُورٌ رَحِيمٌ
অর্থ. তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামতকে গণনা করতে চাও, তাহলে গুনে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
কিন্তু মানুষ কখনো এই নেয়ামতগুলো আলোচনাও করে না। বরং এর মধ্যে এমন অনেক নেয়ামত আছে যার অনুভূতিও নেই। তার আলোচনা তো দূরের কথা, বরং অল্প একটু মসিবত এলে সর্বদা মানুষের কাছে তার অভিযোগ বলে বেড়ায়। যেখানেই দেখবে সব স্থানে মানুষ সীমাহীন পেরেশান। অনেকে তো এটা বলতে চায় যে, দুনিয়াতে সবচেয়ে পেরেশান আমি। কেমন জানি অকৃতজ্ঞতা ও নেয়ামতের অস্বীকার মানুষের উপর সাওয়ার হয়েছে। কত ধরনের অসংখ্য নেয়ামত মানুষ ব্যবহার করছে। কখনো নেয়ামতের শুকর আদায় করার তৌফিক জোটেনা। আল্লাহ তাআলা মানুষকে চোখ দান করেছেন। চোখ ও তার দৃষ্টি আল্লাহ তাআলার কত বড় নেয়ামত। কেউ যদি একটি চোখ কোটি টাকার বিনিময়ে কিনতে চায়, তাহলে সল্প বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও বিক্রি করতে রাজি না। আপনি যেই চোখটি কোটি টাকা দিয়ে দিতে চাচ্ছেন না, আপনি কি কখনো চিন্তা করেছেন যে, সেই চোখটিই আল্লাহ তাআলা কোনো ধরণের আবেদন ছাড়াই দান করেছেন। এর জন্য কী ধরণের শুকর আদায় করা প্রয়োজন ছিল? চোখ তো বড় কথা চোখের উপর যে পাতা আছে, এবং পলক ফেলানো, এটা কত বড় নেয়ামত যে, একদিন এক রাত যদি চোখের পাতা খুলে রাখা হয়, চোখ বন্ধ না করা হয়, তাহলে চোখের দৃষ্টি চলে যাবে। চোখের দ্বারা শুধু রংয়ের পার্থক্য করার জন্য আল্লাহ তাআলা সাত লাখ(ংবষষং ) সেল্স বানিয়েছেন। এর দ্বারা মানুষ চোখ খুলে রংএর পার্থক্য করতে পারে। এর উপরও মানুষের শুকরিয়া আদায়ের তাওফিক হয় না।
কয়েক দিন পুর্বে আমাদের এখানে এক জন মহিলা এসে খুব কষ্টের সাথে তার সমস্যার কথা বলছিল, আর দুআ চাচ্ছিল। সমস্যা ছিল তার মেয়ের চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। তিনি বললেন, কিছুক্ষণ পর পর কৃত্রিম পানি দিতে হয়। পানি দিতে যদি দেরি হয়ে যায়, তাহলে তার চোখ ফুলে যায়, ও ব্যথা করতে থাকে। আমরা কি কখনো চিন্তা করেছি কত সাধারণ ভাবে আমরা চোখের পলক ফেলি, চোখ ঘুরাই। কে এর মধ্যে গ্রেসিং করে। চোখের ভিতর এক ধরণের (মষধহফ ) আল্লাহ তাআলা বানিয়েছেন। যার দ্বারা সর্বদা চোখে পানি সরবরাহ করে। ফলে চোখ ভিজা থাকে। শুধু এই পদ্ধতিটি কতো বড় নেয়ামত ভেবেছি কি? এটি খারাপ হয়ে যাওয়ার কারণে একটি পরিবারের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
মানুষের গলায় দুটি নালী থাকে একটি শ্বাসনালী আর অপরটি খাদ্যনালী। রক্তের নালী তার থেকে দূরে থাকে। মানুষের পানাহার করার পর খাদ্যনালীতে একটি লক লেগে যায়, বন্ধ হয়ে যায়। এর পর যদি পানি পান করে মানুষ শুয়ে যায় বা উল্টো হয়, তাহলে এক ফোটা পানিও বের হবে না। জেদ্দা প্রবাসী এক বন্ধু তার ভাইয়ের অসুস্থতার কথা বলল, যে, তার ভায়ের গলার লক খারাপ হয়ে গেছে। ফলে সর্বদা চেয়ারে বসে থাকতে হয় শুইতে পারে না। শোয়ালে পেটের ময়লা মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়।
আমরা কি কখনো ভেবেছি, যে, চোখের মধ্যে পানির নেজাম, খাদ্য নালী বন্ধ হওয়া, শ্বাসনালীতে খাদ্য না যাওয়া আল্লাহ তাআলার কত বড় নেয়ামত?

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ