শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান শুধুমাত্র দা’য়ীর অধিকার

শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান শুধুমাত্র দা’য়ীর অধিকার
ইতিহাসের পাতায় যদি দেখা হয়, তাহলে একথা স্বাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ তায়ালা দাওয়াতের সাথে জড়িয়ে দিয়েছেন দাপট, শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাব এবং আত্মমর্যাদাবোধ। বাহ্যিক দৃষ্টিতে দা’য়ীকে দেখতে যতই দুর্বল, গরিব ও অজ্ঞ মনে হোক না কেন, কিন্তু তাকে দেয়া হয়েছে দাপট, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রভাব ও মর্যাদা। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী সত্যের দাওয়াত দান করে। মাদউ (যাকে দাওয়াত দেয়া হয় ) দাওয়াত গ্রহণ করার পরিবর্তে, অস্বীকার ও কুফরী করে এবং বিরোধিতায় আসে। তাহলে আল্লাহ তায়ালা মাদউ জাতিকে দাওয়াতের ইতমামে হুজ্জত আদায় হওয়ার পর, তার শক্তি দ্বারা মিটিয়ে দিবেন। আর দা‘য়ী জাতিকে মাদউ জাতির রাজত্ব ও বাদশাহীর ওয়ারিস বানিয়ে দেন। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তায়ালা যত আম্বিয়া (আ.) ও তাদের সম্প্রদায়ের ঘটনাসমূহ উল্লেখ করেছেন, ঐ সব ঘটনা সমূহের মধ্যে শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার অনুসারীদের সান্ত্বনার জন্য, এই পবিত্র অভ্যাসের কথাও আলোচনা করা হয়েছে। সমস্ত আম্বিয়া (আ.) তার জাতির সাথে কথপোকথনের যেই রেকর্ড কুরআন শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে তার উপর চিন্তা-ভাবনা করলে একথা স্পষ্ট হয়ে যায়। দা’য়ীকে প্রভাব শ্রেষ্ঠত্ব, রাজত্ব ও সম্মানের অধিকার দান করা হয়েছে। আর মাদউর জন্য লাঞ্ছনার ভয় এবং প্রজা হওয়ার শাস্তি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এটা একটি বাস্তব সত্য যে, আম্বিয়া (আ.)-এর ঘটনাসমূহ যদি একটু সুচিন্তিতভাবে অধ্যয়ন করা যায়, তাহলে একজন সুস্থমস্তিষ্ক ব্যক্তি দাওয়াতের মহত্বকে স্বীকার করে নিবে। উদাহরণস্বরূপ মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনার মধ্যে দা’য়ীর সম্মান ও মর্যাদা এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্ব, গাম্ভীর্যতা যা খুলে খুলে বলা হয়েছে।

দা’য়ীর সম্মান ও মর্যাদার একটি ঘটনা
হযরত মুসা (আ.) হলেন বনী ইসরাইলের পুরনো এবং জাগতিক দিক থেকেও অবশিষ্ট এক মজলুম জাতির একজন সদস্য। বাহ্যত ফেরাউনের ঘরে লালিত-পালিত হয়েছেন। কিবতিকে ঘুঁষি মারা এবং তাকে হত্যা করার কারণে ফেরাউন ছিল তাঁর প্রতি ক্ষিপ্ত। তাঁর মুখে জড়তা ছিল। ফলে তার ভাই হারুন (আ.) কে নবী বানানোর জন্য আল্লাহর দরবারে আবেদন করেছিলেন। নবুওয়াত দান করার সময় নিম্নের ভাষায় দু’আ করলেনÑ
قَـالَ رَبِّ اشْـرَحْ لِـيْ صَـدْرِىْ ۝ وَيَـسِّـرْ لِـيْ أَمْـرِىْ ۝ وَاحْـلُـلْ عُـقْـدَةً مِـنْ لِـسَـانِـىْ ۝ يَـفْـقَـهُـوا قَـوْلِـىْ ۝ وَاجْـعَـلْ لِـىْ وَزِيْـرًا مِـنْ أَهْـلِـىْ ۝ هَـارُوْنَ أَخِـىْ ۝ اشْـدُدْ بِـه أَزْرِىْ ۝ وَأَشْـرِكْـهُ فِـىْ أَمْـرِىْ ۝ كَـيْ نُـسَـبِّـحَـكَ كَـثِـيْـرًا ۝ وَنَـذْكُـرَكَ كَـثِـيْـرًا ۝ إِنَّـكَ كُنْـتَ بِـنَـا بَـصِـيْـرًا ۝ قَـالَ قَـدْ أُوتِـيْـتَ سُـؤْلَـكَ يَـا مُـوْسٰـى ۝ وَلَـقَـدْ مَـنَـنَّا عَـلَـيْـكَ مَـرَّةً أُخْـرٰى ۝ إِذْ أَوْحَـيْـنَـا إِلٰـى أُمِّـكَ مَـا يُـوْحٰـى ۝
অর্থ: মুসা বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে এবং আমার পরিবারবর্গের মধ্য থেকে আমার একজন সাহায্যকারী করে দিন। আমার ভাই হারুন। তার মাধ্যমে আমার কোমর মজবুত করুন এবং তাকে আমার কাজে অংশীদার করুন। যাতে আমরা বেশি করে আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারি এবং বেশি পরিমাণে আপনাকে স্মরণ করতে পারি। আপনি তো আমাদের অবস্থা সবই দেখছেন। আল্লাহ বললেন, হে মুসা, তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেয়া হলো। আমি তোমার প্রতি আরও একবার অনুগ্রহ করেছিলাম। যখন আমি তোমার মাতাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যা অতঃপর বর্ণিত হচ্ছে। -সূরা ত্বহা- ২৫-৩৮
অন্য একস্থানে মুসা আলাইহিস সালাম এর আবেদন এই ভাবে বর্ণনা করেছেনÑ
قَالَ رَبِّ إِنِّـىْ قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَنْ يَقْتُلُـوْنِ ۝ وَأَخِـىْ هَارُوْنُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّـىْ لِسَانًا فَأَرْسِلْـهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِـىْ إِنِّـىْ أَخَافُ أَنْ يُكَذِّبُوْنِ
অর্থ: মুসা বলল, হে আমার প্রতিপালক, আমি তাদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। আমার ভাই হারূন, সে আমার অপেক্ষা প্রাঞ্জলভাষী। অতএব, তাকে আমার সাথে সাহায্যের জন্যে প্রেরণ করুন। সে আমাকে সমর্থন জানাবে। আমি আশংকা করি যে, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে।-সূরা কাসাস-৩৩-৩৪
হযরত মুসা (আ.)-এর অক্ষমতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনÑ
قَالَ سَنَشُدُّ عَضُدَكَ بِأَخِيْكَ وَنَجْعَلُ لَكُمَا سُلْطَانًا فَلَا يَصِلُوْنَ إِلَيْكُمَا بِآَيَاتِنَا أَنْتُمَا وَمَنِ اتَّبَعَكُمَا الْغَالِبُوْنَ
অর্থ: আল্লাহ্ বললেন, আমি তোমার বাহু শক্তিশালী করব তোমার ভাই দ্বারা এবং তোমাদের প্রাধান্য দান করব। ফলে, তারা তোমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। আমার নিদর্শনাবলির জোরে তোমার এবং তোমাদের অনুসারীরা প্রবল থাকবে।-সূরা কাসাস-৩৫
ইরশাদ হলো, প্রকাশ্যে তোমাকে সান্ত্বনা দেয়া এবং তোমার মনের প্রশান্তির জন্য তোমার ভাইকে তোমার সহযোগী বানাচ্ছি এবং তোমাদের দুজনের দাওয়াতের মর্যাদার কারণে শ্রেষ্ঠত্ব ও দাপট দান করেছি। আর তোমাদের হেফাজতের দায়িত্ব নিচ্ছি। তারা তোমাকে স্পর্শও করতে পারবে না। আর তোমাদেরকে সুসংবাদ দিচ্ছি যে, তোমরা দুজন এবং তোমাদের অনুসারীদেরকে বিজয় দান করব।
এখানে এ বিষয়টিও বুঝা যায় যে, দা‘য়ী যখন তার দায়িত্ব পালনের জন্য ময়দানে নেমে যায় এবং এই পবিত্র কাজের উপকরণের প্রয়োজন বোধ করে যদি আল্লাহর দরবারে দুআ করে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার পক্ষ থেকে তা পূরণ করে দেন। অন্য এক স্থানে তাঁদের দু’জনের ফেরাউনের কাছে গমন ও তার সাথে সংলাপের কথা আলোচনা করা হয়েছে। একদিকে হযরত মুসা (আ.) বাহ্যত ফেরাউনের সাহায্য, দয়া-মায়ায় লালিত পালিত হয়েছেন। কিবতির হত্যা সংক্রান্ত অপবাদে পলাতক ব্যক্তি। অপরদিকে ফেরাউনের মতো অত্যাচারি বাদশাহ, প্রভুর দাবিদার। কিন্তু হযরত মুসা আলাইহিস সালাম দা‘য়ী। আর ফেরাউন হলো মাদউ। এই প্রেক্ষাপটে কুরআনে কারিমের এই আয়াত পড়–ন।
وَلَقَدْ اٰتَيْنَا مُوْسٰى تِسْعَ اٰيٰتٍ بَيِّنٰتٍ فَسْئَلْ بَنِىْ اِسْرَاءِيْلَ اِذْجَاءَ هُمْ فَقَالَ لَهٗ فِرْعَوْنُ اِنِّى لَاَظُنُّكَ يٰمُوْسٰى مَسْحُوْرًا
অর্থ : তুমি বনী ইসরাঈলকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ আমি মূসাকে নয়টি স্পষ্ট নিদর্শন দিয়াছিলাম; যখন সে তাহাদের নিকট আসিয়াছিল, ফিরাউন তাহকে বলিয়াছিল, হে মূসা! আমি মনে করি তুমি তো
জাদুগ্রস্ত।-সূরা বনী ইসরাইল – ১০১
দেখুন এখানে দা‘য়ীর দাপট আর মাদউর ভয়। কত খোশামোদির সাথে ফেরাউন প্রভাবিত হয়ে বলছে, হে মুসা আমার মনে হচ্ছে তোমাকে কেউ জাদু করে দিয়েছে। তুমি তো এমন ছিলে না। তোমার উপর কোনো উপরি প্রভাব হয়েছে। হযরত মুসা (আ.)-এর প্রভাব ও দাপট দেখেন: সে সময়ের বাদশাহ, সিংহাসনে বসা কিন্তু সেই দরবারে পৌঁছে নির্বিঘেœ উত্তর দিচ্ছেন।
قَالَ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا أَنْزَلَ هٰؤُلَاءِ إِلَّا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ بَصَائِرَ وَإِنِّـىْ لَأَظُنُّكَ يَا فِرْعَوْنُ مَثْبُوْرًا.

তিনি বললেন : তুমি জান যে, আসমান ও যমিনের পালনকর্তাই এসব নিদর্শনাবলি প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ নাযিল করেছেন। হে ফেরাউন, আমার ধারণা তুমি ধ্বংস হতে চলেছ।-সূরা বনি ইসরাইল -১০২
একটু চিন্তা করুন, কী ধরনের প্রভাবপূর্ণ উত্তর? যেন বলছেন, তুমি খুব ভালো করে জেনে রাখো, আমি যেই বার্তাগুলো পৌছাচ্ছি, তা আসমানের মালিকের পক্ষ থেকে যাতে তোমার চোখ খোলে যায়।
এর পর বললেন, হে ফেরাউন! আমার তো মনে হয়, তোমার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে, দুর্ভাগ্য তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। এখানে বনী ইসরায়েলের ইতিহাস সাক্ষী, যে, দাওয়াতের হুজ্জত পেশ করার পর, অস্বীকারকারীকে দেয়া হয়েছে। মুসা (আ.) ও হারুন (আ.) এবং তাদের ভুখণ্ড থেকে বনী ইসরায়েলকে তার ওয়ারিস বানানো হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেনÑ
فَأَخْرَجْنَاهُمْ مِنْ جَنَّاتٍ وَعُيُوْنٍ ۝ وَكُنُوْزٍ وَمَقَامٍ كَرِيْمٍ ۝ كَذٰلِكَ وَأَوْرَثْـنَاهَا بَنِـىْ إِسْرَائِيْلَ .
অতঃপর আমি ফেরাউনের দলকে তাদের বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাসমূহ থেকে বহিষ্কার করলাম এবং ধন-ভাণ্ডার ও মনোরম স্থান সমূহ থেকে। এরূপই হয়েছিল এবং বনী-ইসরাঈলকে করে দিলাম এসবের মালিক।
-আশ্শুআরা- ৫৭-৫৯
এই প্রভাব, ওয়াকার, ফেরাউনের মতো অত্যাচারী, জালেম বাদশার সামনে দেখানো এটা দা‘য়ীর মাকাম, স্তর যা মুসা (আ.) কে দান করা হয়েছিল। এটা শুধু মুসা (আ.)-এর সাথে নির্দিষ্ট নয়। বরং সকল নবীকে এই মাকাম, স্তর দান করা হয়েছে। এ কথা ঠিক, দাওয়াতের পূর্ণতা ও দৃঢ়তার জন্য শুরুতে কিছু পরীক্ষা আসে। তবে ফল সর্বদা দা‘য়ীর পক্ষেই হয়। এই মূলনীতি শুধু আম্বিয়া (আ.) এর সাথে খাস নয়। বরং সত্য দা‘য়ী যিনি নববী পদ্ধতিতে কর্মরত অবস্থায় নবীর অনুসরণের প্রতিজ্ঞা করে দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করছে তার সাথেও একই আচরণ করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
كُلًّا نُمِدُّ هٰؤُلَاءِ وَهٰؤُلَاءِ مِنْ عَطَاءِ رَبِّكَ وَمَا كَانَ عَطَاءُ رَبِّكَ مَحْظُوْرًا .
এদেরকে এবং ওদেরকে প্রত্যেককে আমি আপনার পালনকর্তার দান পৌঁছে দেই এবং আপনার পালনকর্তার দান অবধারিত।
-সূরা বনী ইসরাইল-২০
এই জাতি যদি তাদের হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে চায়। তাদের দুনিয়ার বিজয় ও প্রভাব এবং ওয়াকার যদি ঠিক রাখতে চায়। তাহলে তার সমাধান শুধু এটিই যে দা‘য়ী উম্মত হয়ে নিজেকে উত্তম জাতি বলে প্রমাণিত করবে। পথভ্রষ্ট মানুষকে কুফর ও শিরকের অন্ধকার থেকে বের করে ঈমানের নূর ও আলোর দিকে নিয়ে আসাকে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বানাবে।

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী দা.বা.
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ