সহযোগী হও, প্রতিপক্ষ হয়ো না

সহযোগী হও, প্রতিপক্ষ হয়ো না
সামনে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর মাঝে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, দ্বীনের বিভিন্ন শাখার কর্মীদের মাঝে পরস্পর সু-সম্পর্ক ও সহযোগিতার মানসিকতা বিলীন হয়ে গেছে। এমনকি পরিস্থিতি এই দাঁড়িয়েছে যে, কোনো এক শাখার একই ব্যবস্থাপনাধীন লোকদের মাঝেও পরস্পর বড় ধরনের বিরোধ দেখা দেয়। জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয় অন্যকে খাটো করে নিজের অবস্থান উর্ধ্বে তুলে ধরার মধ্যে। ঈমান ও কুফর, হক ও বতিলের দ্বন্দ্বের পরিবর্তে শুরু হয় অন্য এক লড়াই। প্রত্যেকের ধারণা আমি যা কিছু করছি বা আমার দ্বারা যে কাজ হচ্ছে, সেটিই কাজ, আর সেটিই হক ও সত্য। অন্যরা যা কিছু করছে তা কোনো কাজই না। এভাবে নিজের কাজের প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্যের কাজকে তুচ্ছ মনে করার মানুসিকতাটাই মুখ্য হয়ে ওঠেছে।
আমাদের মাঝে অপর কোনো শাখার বা সংস্থার কর্মীদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও স্বীকৃতির মানসিকতা হারিয়ে গেছে। যার ফলে আল্লাহপ্রদত্ত মূল্যবান যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাগুলো অসৎ ও অকল্যানকর কাজে নষ্ট হচ্ছে। এজন্য জাতির হৃদয়বান ব্যক্তিদের ও দ্বীনের খাদেমদের চেষ্টা করতে হবে এই ব্যাধি দূর করার। সেই সৌভাগ্যবানকে আল্লাহ তাআলা দ্বীনের কোনো একটি অংশে খেদমত করার সুযোগ দিয়েছেন, তার কর্তব্য, এই ব্যাধি দূর করার চেষ্টা করা।
আমেরিকায় অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন ইসলামের দাওয়াত দেয়ার চেষ্টা করছেন। আমার পরম শ্রদ্ধেয় মুরুব্বী হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) কে তাঁর আমেরিকার সফরে ওখানকার হিতাকাঙ্খীগণ সেদেশের দ্বীনের কর্মীদের মাঝে পরস্পর সম্পর্ক ও সহযোগীতার অভাবের কথা জানিয়ে চিকিৎসার আবেদন জানালে হযরত মাওলানা (রহ.) যে আলোচনা করেছিলেন তার সারমর্ম তুলে ধরছি।
‘‘দুটি বস্তুকে একত্রিত করার জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। দুটি কাগজকে একসাথে মিলানোর জন্য গাম ব্যবহারের করতে হয়। একটি কাঠকে অন্য একটি কাঠের সাথে যুক্ত করার জন্য বিশেষ ধরনের গাম ব্যবহার করা হয়। তদ্রƒপ অন্তরের সাথে অন্তর জোড়া লাগানোর জন্য এক প্রকার গাম আছে। আর তা হলো ইখলাস এবং আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক। ইখলাস ও আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই হতে পারে পরস্পর মিলন। এক অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শের মাধ্যমে একথা স্পষ্ট হয়, দ্বীনের বিভিন্ন শাখার কর্মীদের মাঝে পরস্পরের দূরত্ব ও সম্পর্কের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার কারণ হলো, ইখলাস কম থাকা।”
এখলাছের নিদর্শন ও তা চেনার উপায় সম্পর্কে হযরত সাইয়েদ আহমদ শহীদ রহ.- এর একটি বানী আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘দ্বীনের একাটি মৌলিক স্বীকৃত নীতি হল ইখলাস ছাড়া কোনো আমল গ্রহনযোগ্য হয় না। এখলাসের মাপকাঠি হল, দ্বীনের প্রতিটি কর্মীর প্রতি তার দ্বারা অনুগৃহীত হওয়ার অনুভতি নিজের অন্তরে সৃষ্টি হওয়া। যদি কারো অন্তরে অন্যের দ্বারা অনুগৃহীত হওয়ার অনুভতি সৃষ্টি হয়, তাহলে বুঝা যাবে তার অন্তরে ইখলাস আছে, অন্যথায় নেই।
যদি অন্তরে প্রতিহিংসা সৃষ্টি হয়, মনে করে তার প্রতিষ্ঠান কেন চলছে? সে কেন কাজ করছে? অন্যের মাধ্যমে কোনো কাজ সম্পাদিত হলে সেটাকে কাজই মনে করা হয়না। ব্যাস! কাজ তো সেটিই যা আমি করছি। যদি নিয়ত এমনই হয়, তাহলে তার জন্য উচিৎ সে যেন তার নিয়তকে শুদ্ধ করে, অন্যথায় কাজ বন্ধ করে দেয়।
ইখলাস হল, প্রত্যেকেই দ্বীনের প্রতিটি কাজকে নিজের কাজ মনে করবে। মনে করুন, আপনার একটি বিডিং তৈরী হচ্ছে। কেউ এসে সেখানে শ্রম দিতে লাগল, বালির সাথে সিমেন্ট মিলাতে শুরু করল, ইট এগিয়ে দিল, আপনি কি তার এটাকে তার অনুগ্রহ বলে মনে করবেন না? আপনি তো মনে করবেন এ কাজগুলো আমারই ছিল, ঐ ব্যক্তি আমার হয়ে আমার কাজটা করে দিচ্ছে। আল্লাামা শওকানী (রহ.)ও এই মূলনীতিটি উল্লেখ করে বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি কোথাও দ্বীনের কোনো শাখায় কাজ করতেথাকে, আর সেখানে তার চেয়েওে ভাল কোনো কর্মী চলে আসে, তাহলে এখলাসের পরিচয় হল আগত ব্যক্তিকে অনুগ্রহকারী মনে করে কাজের সুযোগ দেবে এবং নিজে অন্যস্থানে কাজ শুরু করবে। আগত কর্মীকে পূর্ণ সহযোগীতা করবে। মোটকথা, দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মকর্তাদের মাঝে পরস্পর সম্পর্ক ও সহযোগীতার মূল ভিত্তি হতে পারে এখালাস ও আল্লাাহর সাথে মজবুত সম্পর্ক।
এখালাস অন্তরের এমন এক অবস্থার নাম, যা প্রতিটি মানুষের থাকা উচিৎ। অন্তরে ইখলাস সৃষ্টি করা এবং তা বজায় রাখার হুকুমও শরিয়ত দিয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, ইখলাস সৃষ্টি করা এবং তার উপর দৃঢ় থাকা ইখতিয়ার ও সামর্থের ভিতরের বিষয়। কখনো কখনো মানুষক কাজের শুরুতে খুবই মুখলিস থাকে। কিন্তু পরে ইখলাস কমতে কমতে শেষ হয়ে যায়। আবার কখনো এর বিপরীতও ঘটে। কাজের শুরুতে ইখলাস থাকে না, পরে ধীরে ধীরে ইখলাস নসিব হয়ে যায়। অন্তরে ইখলাস সৃষ্টি করা এবং তা বজায় রাখার জন্য অভিজ্ঞতার আলোকে একটি পদ্ধতির কথা বলছি।
অন্যের সাথে মিলে কাজ করবে এবং অন্যের পেছনে পেছনে থাকার মেজাজ তৈরী করেবে। মানুষকে নিজের সাথে জুড়ানোর চেষ্টা করবে না। আজকাল দ্বীনের খাদেম এবং ধর্মীয় সংগঠনে কর্মীরা চেষ্টা করেন, সকলেই যেন আমার দলে চলে আসে এবং আমার পিছনে থেকে কাজ করে। হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর ভাষ্যমতে “ প্রত্যেকই অনুসণীয় হতে চায়, তাহলে অনুসারী আসবে কোত্থেকে।” এজন্য নিজেকে মুক্তাদী (অনুসরণকারী) বানান। অনুসরনীয় সাজা থেকে বিরত থাকুন। অনুসারী হয়ে অন্যের সাথে মিলে কাজ করার মধ্যে শুরুতে ইখলাস থাকে এবং ধীরে ধীরে তা বারতেই থাকে।
দ্বীনের যেই কর্মী নিজেকে অনুসৃত বানাতে চায় এবং সকল মানুষকে নিজেন সাথে মিলাতে চেষ্টা করে। প্রথমত তার অন্তরে ইখলাসই থাকে না। আর যদি কিছু থাকে, তাহলে সেটাও আস্তে আস্তে চলে যায়। এর বিপরীত অনুসারী হয়ে অন্যের সাথে মিলে কাজ কারার মধ্যে শুরুতেই ইখলাস থাকে এবং ধীরে ধীরে তা বারতেই থাকে। শুরু থেকে যদি ইখলাস না-ও থাকে, একপর্যায়ে ইখলাস সৃষ্টি হয়ে যায়। তাই দ্বীনের প্রতিটি সেবককে অন্যের সাথে মিলে ও পিছনে থেকে কাজ করার পরামর্শ দেয়া উচিত। এতে যদিও অন্তরে খুব কষ্ট লাগে কিন্তু এর মধ্যেই রয়েছে বরকত ও নিরাপত্তা। যে অন্যের সাথে মিলে কাজ করতে পারে সে দ্বীনের যে কোনো খাদেমের সহযোগী হয়ে থাকে, প্রতিপক্ষ হয় না।
হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ. এর একটি বাণী আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা।
“দ্বীনের প্রতিটি কর্মীর সহযোগী হও, প্রতিবন্ধক নও”
আফসোস! মানুষ যখন নিজের ব্যক্তিগত নিমগ্নতা ও জীবিকার কাজে লেগে থাকে তখন অন্তরঙ্গতা ও ভালোবাসার সাথে একে অপরের কাজে সহযোগী হয়। সেই লোকগুলোই যখন দ্বীনের কাজে যোগ দেয় তখন তৈরী হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা। অথচ দ্বীন তাদের মাঝে মিলন সৃষ্টির জন্যই এসেছে। এ ব্যাপারে কুর’আনে পাক ঘোষণা দেয়
*وَاعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعاً وَلاَ تَفَرَّقُواْ وَاذْكُرُواْ نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُم أَعْدَآءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَاناً وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُمْ مِّنْهَا كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ ءَايَـٰتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ: “আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখ এবং পরস্পরে বিভেদ সৃষ্টি করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ রাখ, এক সময় তোমরা একে অন্যের শত্র“ ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের
অন্তরসমূহকে জুড়ে দিয়েছেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে। আল্লাহ তোমাদেরকে সেখান থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নিদর্শনসমূহ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা সৎ পথ পেতে পার।”
Ñসূরা আলে ইমরান (৩) :১০৩
কখনো কখনো কোনো মুখলিস ব্যক্তিও শিকার হয়ে যান এই
ভ্রান্তির। দ্বীনের কোনো বিশেষ শাখায়, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে, কোনো সংগঠন অথবা সংস্থার সাথে মিলে, আথবা কোনো বড় মুরব্বীর সম্মান ও ভালোবাসায় তার অধীনে কোনো একজন কাজ করছে । এখন এ কর্মীর মনে আগ্রহ জাগল, অন্য লোকেরাও যেন দ্বীনের ওই শাখায়, ওই সংগঠনের আওতায় কিংবা ওই শাইখের অধীনে কাজ করতে চলে আসে। একদিক থেকে এটা মানুষের স্বভাবজাত অনুভুতি। তবে এ আগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে যদি এ মনোভাবও সৃষ্টি হয় যে, অন্য মানুষ তার নিজস্ব দ্বীনী কাজ ছেড়ে দিক, অথবা সেই কাজ বাধাপ্রাপ্ত হোক , তাহলে সেটি সঠিক নয়। আর এটা সম্ভবও নয়।ধরুন আপনি যদি মনে করেন আপনার পিতাকে যেহেতু আপনি পিতা মনে করেন তাই অন্যরাও নিজের পিতাকে বাদ দিয়ে আপনার পিতাকে পিতা হিসেবে গ্রহন করবেন অথবা সকলেই নিজের মামাকে ছেড়ে আপনার মামাকে মামা বলে ডাকতে থাকবেন।এটাতোএকটা ভুল চিন্তা।
আপনি দ্বীনের বিভিন্ন শাখায় এবং বিভিন্ন মাধ্যমে দ্বীনের কোনো খাদেমকে সহযোগিতা করবেন এবং নিজের কাজে তার সহযোগিতাও কামনা করবেন, কিন্তু ঐ ব্যক্তিকে তার কাজ থেকে সরিয়ে নিজের কাজের সাথে যুক্ত করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কারন তিনি ওই কাজটির সাথে যুক্ত হয়েছেন অনেক চেষ্টা-সাধনার পর। দ্বীনের কাজের জন্য নিজের ব্যক্তিগত বিভিন্ন কজের চাপের ভিতরে একটি তরতীব ঠিক করেছেন। আপনি যদি তাকে তার কাজ থেকে সরিয়ে দেন, তাহলে শয়তান এবং নফস তাকে সব ধরনের কাজ থেকেই সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে।
এটা তো জরুরী নয় যে, তার অবস্থা আপনার কর্মপদ্ধতির সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে। বরং অধিকাংশ সময় এমন হয়, কেউ যে পদ্ধতিতে দ্বীনের কাজ করছে, যখন সেটাকে ছেড়ে দেয়, তখন অন্য কাজের সাথে নিজেকে আর মিলাতে পারে না। এমন অবস্থায় একুল-ওকুল উভয়ই ছুটে যায়।
একারণেই দ্বীনের কেনো খাদেম নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠনের সাথে লেগে থাকলে তাকে সে কাজ থেকে পৃথক করা কোনোভাবেই কল্যাণকর নয়। তাকে তার কাজের সাথে লাগিয়ে রেখেই আপনি আপনার জন্য তার পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশা করতে পারেন। উত্তম পন্থা হল, আপনার কর্মতৎপরতা ও সংগঠনের সহযোগীতার জন্য এমন ব্যক্তিদেরকেই নির্বাচন করুন, যারা দ্বীনের কোন শাখায়ই এখনও সম্পৃক্ত নয়। এধরনের লোকদেরকে দ্বীনি কাজের সাথে লাগিয়ে দেয়া হবে বড় ধরনের খেদমত।
প্রতিটি মানুষের মাঝে কিছু সৌন্দর্য ও সুকর্ম থাকে, সাথে সাথে থাকে কিছু অপরিপক্কতা ও অক্ষমতাও। পাপ ও দুর্বলতা থেকে তো শুধু নবীরাই মুক্ত থাকেন। আমাদের মজলিসগুলোতে বসলেই পরস্পর বৈরিতার কারণে গীবতের চর্চা অবধারিত হয়ে থাকে। এ জন্য প্রয়োজন দ্বীনের প্রত্যেক কর্মী অপর কর্মীর কাজকে স্বীকার করা। তাদের অন্তরকে প্রশস্ত করা। এজন্য অন্যের দ্বারা অনুগৃহীত হওয়ার অনুভূতি প্রথমে নিজের থেকে শুরু করতে হবে। এরপর কাজের সহযোগীদের মাঝে ধন্যবাদ দেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আর বাধা দিতে হবে অশোভনীয় বাক্য থেকে। এর ফলে পরস্পরের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে। এতে জাতির গ্রহনযোগ্য একটি দলের যোগ্যতা সঠিক খাতে ব্যবহৃত হবে। এই মুমিনরাই সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর বাস্তব নমুনা হতে পারবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয় সাল্লাম বলেছেন,“এক মুমিন আরেক মুমিনের জন্য দেয়ালের ইটের মতো, একে অন্যের শক্তি যোগাবে।’’
(বি: দ্র: উপরোল্লেখিত রচনাটি আরমুগানের যেই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল সেই সংখ্যার শেষ পৃষ্ঠায় মুফাক্কিরে ইসলাম হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর বক্তব্যের নির্বাচিত একটি অংশও প্রকাশ করা হয়েছিল। বক্ষমান নিবন্ধ আর ঐ বক্তব্যের অংশ টুকুর বিষয়বস্তু অভিন্ন হওয়ায় সেটিও এখানে সংযুক্ত করছি।)
পরস্পরের ঐক্য এবং একজন অপরজনকে নিজের সাথে মিলানো এবং কাছে টানার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো বস্তুত দুনিয়াতে সৃষ্টি হয়নি। বরং ঐক্য ও এত্তেবা এটা আল্লাহপাকের খাছ তৌফিক ও বিশেষ পুরস্কার। যেনম : কুরআনে হাকিমে আল্লাহ তাআলা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন,
“হে নবী! আপনি যদি পুরা দুনিয়ার সকল খাজানা গুলো খরচ করে দেন। তাহলে ঐ সাহাবাদের অন্তরের ভালবাসা ও মহব্বত ঐক্য ও সমৃদ্ধ তৈরী করতে পারবেন না।
বরং আল্লাহ তাআলাই তার অনুগ্রহে তাদের অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
বাহ্যত ঐক্যের উপলক্ষ হতে পারে কেবল ভীতির অনুভূতি। যখন ক্ষয়ক্ষতি ও ভীতির অনুভূতি জেগে উঠে মানুষ আপনা-আপনিই ঐক্যবদ্ধ হয়। আমরা যারা হিন্দুস্থানে আছি, পরস্পরে বিক্ষিপ্ততার স্বীকার হয়ে একে অপরের মাঝে ভুল বুঝা-বুঝি সৃষ্টি করছি, এর কারণ হলো বিপদের আশংকা আমাদের মাঝে নেই।
আল্লাহর শোকর স্বভাবগত ভাবে আমি নিরাশ নই। এই কঠিন যুগেও, মানুষ যখন ইসলাম ও মুসলমানকে বিপদের সম্মুুখীন মানে করছে এবং হিন্দুস্থানেও স্পেনের মতো অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছে, আমি এমন মুহূর্তেও নিরাশ হইনি। কিন্তু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ফলে আমার অনুভূতি এই যে, মুসলমানের অবস্থা শোচনীয় হতে চলেছে। অবস্থা তো এ পর্যায়ের চলেগেছে যে, যদি কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির বা কোনো সংগঠনের সাথে অপর সংগঠনের বিরোধিতার বাস্তব মাত্রা থাকে এক ভাগ তাহলে সে বিরোধিতাটাই প্রকাশিত হচ্ছে শতভাগ ক্ষেত্রে।
আফসোস! আমারা নিজেদের মহত্বগিরীর করণে, অন্যের সম্মানকে ধূলিসাৎ করে দেয়ার হিন চেষ্টা করছি। নিজেদের মধ্যে বিরোধিতার যেই আচরণ করি, প্রতিবেশী জাতিদের বেলায় এর এক চতুর্থাংশও পাওয়া যায় না। যেমন গান্ধির সাথে মতবেদ থাকা সত্বেও তাকে তুচ্ছ করা, বদনাম করা, হিন করার অপচেষ্টা করা হয়না। বিশেষত: আমাদের অঙ্গনের একটি ব্যধি হল বিরোধীতায় সীমাতিরঞ্জন করা। আমরা এমন একজাতি, উত্তম চরিত্রের এক মহান ইতিহাস যাদের আছে। এর পরও বিরোধের এই অবস্থাটি খুবই দুঃখ জনক। কোনো ব্যক্তি বা দলের সাথে যদি সামান্যতম বিরোধ থাকে,তাহলে তাকে ছাড় দেয়ার পরিবর্তে অগ্নিবর্ষার মতো তার বিরোধিতা করতে থাকি। কোনো নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব, অথবা প্রতিষ্ঠানের সম্মান এবং তার সফলতাকে স্বীকার করার স্পৃহা বিলীন হতে চলেছে। সামষ্টিক ভাবে পরস্পরে সহযোগিতার যোগ্যতা মুসলমানদের থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে। কাওকে একটু এগিয়ে যেতে দেখলে তার বিরোধ্যে পুরো শক্তি ব্যয় করা আমাদের স্বভাবে পরিনত হয়ে গেছে। এমনও নয় যে, নীতিগত ভাবে কঠোর ইখতিলাফ ও বিরোধ রয়েছে। বরং দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধকে মূল বানিয়ে ফাসাদ সৃষ্টি করার চেষ্টা হচ্ছে। পরিবেষ থেকে চক্ষুবন্ধ করে ফেলা এবং পরিস্থিতিকে অনুকুল করার চেষ্টা না করা আমাদের অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছে। আমরা না অবস্থা বুঝার চেষ্টা করি, না দেশের দিকে খেয়াল করে কখনো একথা চিন্তা করি যে, দেশকে আমাদের কিছু দেওয়ার রয়েছে।
আমাদের অবস্থা একটি দীপের মতো, বরং দীপের মধ্যে ছোট্ট দ্বীপের মতো হয়ে গেছে। ইসলামী জাতি নিজেই একটি দ্বীপ। আবার এই দ্বীপের মধ্যে একটি দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান, প্রত্যেক দল, বরং প্রতিটি সংগঠন পৃথক পৃথক দ্বীপে পরিনত হয়েছে। আমার খুব ভয় হয়, এই দেশ ও দেশবাসীর কী হবে? এখন পর্যন্ত দিয়ানতদারী এবং নিষ্ঠার সাথে কোনো পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছেনা, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান, জামাত, সংগঠন, অথবা কোনো ব্যক্তির বাস্তব উপকারিতা ও তাদের গুন ও মূল্য যথার্থ উপায়ে অনুধাবন করা যেতে পারে। এখন পর্যন্ত এর কোনো চেষ্ঠাও করা হয়নি যে, বেশিরভাগ মানুষ বাস্তবিক ভাবে আমাদেরকে বুঝতে পারে এবং আমাদের উপকারিতা ও প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের পরস্পর মিলে মিশে দ্বীনের কাজ করার তাওফীক দান কন। আমীন।

মূল হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী
অনুবাদ. যুবায়ের আহমদ