হযরত ঈসা আ. সম্পর্কিত আয়াত

হযরত ঈসা আ.- এর বংশীয় প্রেক্ষাপট

হযরত ঈসা আ.-এর মাতার নাম ছিল মারইয়াম। মারিয়ামের পিতার নাম ছিল ইমরান ও মাতার নাম ছিল হান্না। কুরানুল কারীমে তার মাতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
إِذْ قَالَتِ امْرَأَةُ عِمْرَانَ رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ).
অর্থ: ইমরানের স্ত্রী যখন বললো, হে আমার পালনকর্তা ! আমার গর্ভে যা রয়েছে আমি তাকে তোমার নামে উৎসর্গ করলাম সবার কাছ থেকে মুক্ত রেখে। আমার পক্ষ থেকে তুমি তাকে কবুল করে নাও, নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞাত।
ইমরানের স্ত্রীর গর্ভে যে সন্তান জন্মলাভ করেছিল, তিনিই হলেন মারইয়াম। মারইয়াম যখন বড় হলেন, তখন তাঁর গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করলেন হযরত ঈসা আ.। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে।
মারইয়ামের জন্ম
মারইয়ামের মাতা হান্না ছিলেন একজন নেককার মহিলা। তার রেহেমে যখন সন্তান এল, তিনি মানত করলেন। আমার পেটে যে সন্তান এসেছে তাকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে দেব। সে বাইতুল মুকাদ্দাসের খাদেম হবে । তার দ্বারা ব্যক্তিগত ও জাগতিক কোনো কাজ নেব না।
সে সময় ফিলিস্তিনে ইহুদীদের মধ্যে প্রথা ছিল, তাদের পুত্র সন্তানকে বাইতুল মুকাদ্দাসের খেদমতের জন্য ওয়াক্ফ করত। এই কাজকে অনেক বড় ইবাদত মনে করা হতো। হযরত হান্নাহও সেই প্রথা অনুযায়ী মানত করলেন। তিনি যে সন্তান প্রসব করলেন সেটি ছিল কণ্যা সন্তান। ফলে তিনি পেরেশান হয়ে গেলেন। অস্থির হয়ে বলতে লাগলেন- হে আল্লাহ, এটা তো কণ্যা সন্তান ! তাকে কেমন করে উৎসর্গ করব ! কারণ সে সময় মেয়েদেরকে ওয়াকফ (উৎসর্গ) করার প্রথা ছিল না। শুধু ছেলেদেরকেই খেদমতের জন্য রাখা হতো।
আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তাঁকে এলহাম করা হলো। ফলে তিনি শান্ত হলেন। তার নাম রাখলেন মারইয়াম। মারইয়াম ও তার সন্তানাদির জন্য দু‘আ করলেন, তারা যেন শয়তান হতে আশ্রয় পায়।

فَلَمَّا وَضَعَتْهَا قَالَتْ رَبِّ إِنِّي وَضَعْتُهَا أُنْثَى وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنْثَى وَإِنِّي سَمَّيْتُهَا مَرْيَمَ وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
অর্থ: অতঃপর যখন তাকে প্রসব করলো বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমি এক কণ্যা প্রসব করেছি। বস্তুত: সে কী প্রসব করেছে আল্লাহ্ তা ভালোই জানেন। সেই কন্যার মত কোনো পুত্রই যে নেই। আর আমি তার নাম রাখলাম মারইয়াম। আর আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। অভিশপ্ত শয়তানের কবল থেকে।

মারইয়াম আ.- এর লালন পালন
হান্না তার সন্তানের বিষয়টি বাইতুল মুকাদ্দাসের মুতাওয়াল্লিদের অবগত করেন, আল্লাহ তাআলা মুতাওয়াল্লিদের অন্তরে মেয়েকে খাদেম হিসাবে গ্রহণ করার আগ্রহ তৈরী করে দিলেন। এবার তার লালন-পালন করা নিয়ে সমস্যা দাঁড়াল- প্রতিপালনের দায়িত্ব কে নিবে? সকল মুতাওয়াল্লির প্রচ- ইচ্ছা- প্রত্যেকেই যেন এই খাদেমা মেয়ের প্রতিপালনের দায়িত্ব আঞ্জাম করতে পারে।
বিষয়টি ঝগড়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত লটারির সিদ্ধান্ত হয়। এবার প্রত্যেকেই যে কলম দিয়ে তাওরাত লিখতো, সেগুলোকে পানিতে নিক্ষেপ করলেন। সকলের কলম ¯্রােতের সাথে ভেসে গেল, আর যাকারিয়া আ.-এর কলমটি ¯্রােতের উল্টো পথে চলতে লাগল। সকলেই বুঝে নিল হযরত যাকারিয়া আ. হযরত মারইয়ামের লালন পালনের সৌভাগ্য লাভ করলেন । এদিকে হযরত যাকারিয়া আ. সম্পর্কে হযরত মারইয়াম -এর খালু হতেন। তিনি নবীও ছিলেন। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَامَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يَخْتَصِمُونَ (৪৪)
অর্থ: এ হলো গায়েবী সংবাদ যা আমি আপনাকে পাঠিয়ে থাকি। আর আপনি তো তাদের কাছে ছিলেন না, তারা যখন প্রতিযোগিতা করছিল যে, কে প্রতিপালন করবে মারইয়ামকে এবং তখন আপনি তাদের কাছে ছিলেন না, যখন তারা ঝগড়া করছিলো।
আল্লাহ তা‘আলা হযরত হান্নার এই ইবাদত ও কুরবানী কবুল করেছেন এবং হযরত যাকারিয়া আ. মারইয়াম আ. এর লালন পালনের দায়িত্ব আঞ্জাম দিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
فَتَقَبَّلَهَا رَبُّهَا بِقَبُولٍ حَسَنٍ وَأَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا
অর্থ. অত:পর তাঁর পালনকর্তা তাঁকে উত্তম ভাবে গ্রহণ করে নিলেন এবং তাঁকে প্রবৃদ্ধি দান করলেন-অত্যন্ত সুন্দর প্রবৃদ্ধি। আর তাঁকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে সমর্পণ করলেন।
মারইয়াম আ. এর কারামাত
হযরত মারইয়াম আ. যখন একটু বড় হলেন, তখন বাইতুল মুকাদ্দাসের পাশেই তাঁর জন্য একটি ঘর নির্দিষ্ট করা হলো, ওখানে থেকে তিনি দিনের বেলায় ইবাদত করতেন এবং মসজিদের খেদমত করতেন। রাতের বেলায় তার খালার বাড়িতে রাত্রি যাপন করতেন। যাকারিয়া আ. যেহেতু মারইয়ামের প্রতিপালনের দায়িত্বে ছিলেন, তাই মাঝে মাঝে তার কামরায় গিয়ে খোজ খবর নিতেন। তবে তিনি কক্ষে প্রবেশ করে অবাক হয়ে যেতেন, কারণ প্রায়ই মারইয়ামের কাছে অমৌসুমি ফল দেখতে পেতেন। যাকারিয়া আ. জিজ্ঞাসা করলেন, হে মারইয়াম! তোমার কাছে যে সব খাবার ও ফলমূল দেখছি, এগুলো কোথা থেকে এসেছে? তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ যাকে চান তাকে অফুরন্ত রিজিক দান করেন। এটা ছিলো হযরত মারইয়াম আ. -এর কারামত। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কোরআন পাকে বলেন-
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يَا مَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ (৩৭)
অর্থ- যখনই যাকারিয়া তার (তার নিজস্ব) ইবাদত কক্ষে গমন করতেন, তখনই তিনি দেখতে পেতেন সেখানে কিছু খাবার রয়েছে। যাকারিয়া জিজ্ঞেস করতেন- হে মারইয়াম, এসব তোমার কাছে কোত্থেকে আসে ? মারইয়াম জবাব দিতো- এ সব আল্লাহর কাছ থেকে ; অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলা যাকে চান তাকে বিনা হিসাবে রিজিক দান করেন।
মারইয়ামকে সন্তানের সুসংবাদ
হযরত মারইয়াম আ. যখন প্রাপ্ত বয়সে উপনীত হলেন, তখন একদিন ফেরেশতা এসে বললেন, হে মারইয়াম! আমি তোমাকে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে একটি সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি। মারইয়াম এ কথা শুনে ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, আমাকে তো আজ পর্যন্ত কোনো মানুষই স্পর্শ করেনি। অর্থাৎ বিবাহ হয়নি। এটা কেমন করে সম্ভব? যদিও তিনি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অমৌসুমি ফল ও খাবারের কুদরত দেখেছেন। কিন্তু এই প্রশ্ন ছিল মানবিক ও স্বভাবজাতের ভিত্তিতে। ফেরেশতা বললেন, তার নাম হবে মাসিহ ঈসা ইবনে মারইয়াম। হযরত ঈসা আ. এর মোজেজা ও গুণাবলির বিবরণ দিল। এই সবকিছুই আল্লাহ্র জন্য কঠিন ছিল না। বরং যখন আল্লাহ কোনো কিছুর ব্যপারে ইচ্ছা করেন, আর বলেন- হও, সাথে সাথে তা হয়ে যায়। এবিষয়ে কুরআন বলে-
إِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٍ مِنْهُ اسْمُهُ الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيهًا فِي الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ (৪৫) وَيُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلًا وَمِنَ الصَّالِحِينَ (৪৬) قَالَتْ رَبِّ أَنَّى يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ قَالَ كَذَلِكِ اللَّهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (৪৭)
অর্থ: ৪৫. যখন ফেরেশতাগণ বললো, হে মারইয়াম! আল্লাহ্ তোমাকে তাঁর এক বাণীর সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম হলো মসীহ-মারইয়াম-তনয় ঈসা, দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি মহাস¤মানের অধিকারী এবং আল্লাহ্র ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
৪৬. যখন তিনি মায়ের কোলে থাকবেন এবং পূর্ণ বয়স্ক হবেন তখন তিনি মানুষের সাথে কথা বলবেন। আর তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
৪৭. তিনি বললেন, হে পরওয়ারদেগার! কেমন করে আমার সন্তান হবে? আমাকে তো কোনো মানুষ ¯পর্শ করেনি। আল্লাহ্ বললেন, এভাবেই আল্লাহ্ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যখন কোনো কাজ করার জন্য ইচ্ছা করেন তখন বলেন হও; আর সাথে সাথে তা হয়ে যায়।
হযরত ঈসা আ.-এর জন্ম ও হযরত মারইয়াম আ.- এর অস্থিরতা
যখন সন্তান প্রসবের সময় হল। তখন মারইয়াম একটি খেজুর গাছের নিচে চলে গেলেন। সেখানেই হযরত ঈসা আ. জন্মগ্রহণ করলেন। আর হযরত মারইয়াম আ. অস্থির হয়ে গেলেন যে মানুষকে কী উত্তর দিব! তাই তিনি আফসোস করে বলতেছিলেন- হায়! যদি এর আগেই আমার মৃত্যু হয়ে যেত। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে সান্ত¦না দেয়া হলো এবং ভবিষ্যতের কর্তব্য বলে দেয়া হলো। বলা হলো- চিন্তিত হয়ো না। আল্লাহ্ তা‘আলা তোমার কাছে নিচের দিকে পানির ব্যবস্থা করেছেন। সেই পানি ব্যবহার কর। আর যেখানে খেজুরের গাছ হেলানো সেখানে তাজা খেজুর পাওয়া যাবে। তা ভক্ষণ কর। আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করো। আর কোনো মানুষ এলে তাকে বলে দাও আমি মুখের রোজা আছি, আজ আমি কথা বলতে পারবো না। এই ঘটনাটি কোরআনে এই ভাবে বর্ণিত হয়েছে-

فَأَجَاءَهَا الْمَخَاضُ إِلَى جِذْعِ النَّخْلَةِ قَالَتْ يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا وَكُنْتُ نَسْيًا مَنْسِيًّا (২৩) فَنَادَاهَا مِنْ تَحْتِهَا أَلَّا تَحْزَنِي قَدْ جَعَلَ رَبُّكِ تَحْتَكِ سَرِيًّا (২৪) وَهُزِّي إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسَاقِطْ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا (২৫) فَكُلِي وَاشْرَبِي وَقَرِّي عَيْنًا فَإِمَّا تَرَيِنَّ مِنَ الْبَشَرِ أَحَدًا فَقُولِي إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا فَلَنْ أُكَلِّمَ الْيَوْمَ إِنْسِيًّا (২৬)
অর্থ: তারপর প্রসব-বেদনা তাকে একটি খেজুর গাছের কাছে নিয়ে গেল। সে বলতে লাগল, হায়! আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম এবং সম্পূর্ণ বিস্মৃত-বিলুপ্ত হয়ে যেতাম! তখন ফেরেশতা তার নিচে এক স্থান থেকে তাকে ডাক দিয়ে বললো- তুমি দুঃখ করো না, তোমার প্রতিপালক তোমার নিচে একটি উৎস সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর তোমার উপর ঝরে পড়বে। তারপর খাও, পান কর এবং চক্ষু শীতল করো। মানুষের মধ্যে কাউকে আসতে দেখলে (ইশারায়) বলে দিও, আজ আমি দয়াময় আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে একটি রোজা মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কোনো মানুষের সাথে কথা বলব না।
দোলনায় যীশু কথা বলেন
জন্মের পর মারইয়াম যখন তাকে কোলে করে তার সম্প্রদায়ের কাছে এলেন লোকজন আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলতে লাগলো- হে মারইয়াম! তুমি কী করলে? তোমার পিতা তো খারাপ লোক ছিল না, না তোমার মা ছিল খারাপ। মারইয়াম নীরব রইলেন। আর শিশুটির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, তাকে জিজ্ঞাসা করুন- সে কে? লোকেরা বললো- সে তো শিশু, তার কথা বলার বয়স হয় নি। সে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিবে কীভাবে? লোকজন মারইয়ামকে বিভিন্ন প্রশ্নে জর্জরিত করছিল অথচ মারইয়াম ছিলেন নিঃশ্চুপ। এমন সময় হযরত ঈসা আ. কথা বলে উঠলেন। তার মায়ের পবিত্রতা বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন- আমি আল্লাহর বান্দা। আমাকে কিতাব দেয়া হয়েছে এবং আমাকে নবী বানানো হয়েছে। আর আমি যেখানেই থাকবো, বরকতময় হয়ে থাকবো। আর আমি যতদিন জীবিত থাকবো, আমাকে নির্দেশ করা হয়েছে নামাজ আদায় করতে, যাকাত আদায় করতে। আমাকে মায়ের সাথে ভালো ব্যবহারকারী বানানো হয়েছে। দেখুন, এ ব্যাপারে কুরআন কী বলে-

فَأَتَتْ بِهِ قَوْمَهَا تَحْمِلُهُ قَالُوا يَا مَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْئًا فَرِيًّا (২৭) يَا أُخْتَ هَارُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمُّكِ بَغِيًّا (২৮) فَأَشَارَتْ إِلَيْهِ قَالُوا كَيْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِي الْمَهْدِ صَبِيًّا (২৯) قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آَتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا (৩০) وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ ‎وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا (৩১) وَبَرًّا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا (৩২) وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا (৩৩)

অর্থ: তারপর সে শিশুটি নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে আসল। তারা বলে উঠলো, মারইয়াম! তুমি তো বড় কঠিন কাজ করেছ! ওহে হারুনের বোন ! তোমার পিতাও কোনো খারাপ লোক ছিল না এবং তোমার মাও ছিল না অসতী নারী। তখন মারইয়াম শিশুটির দিকে ইশারা করলেন। তারা বলল, আমরা এই দোলনার শিশুর সাথে কেমন করে কথা বলব? অমনি শিশুটি বলে উঠল, আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন আমাকে আল্লাহ্ বরকতময় করেছেন এবং যত দিন জীবিত থাকি আমাকে নামাজ ও যাকাত আদায়ের হুকুম দিয়েছেন এবং আমাকে আমার মায়ের প্রতি অনুগত বানিয়েছেন। আমাকে উদ্ধত ও রূঢ় বানাননি এবং (আল্লাহ্র পক্ষ হতে) আমার প্রতি শান্তি যে দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যে দিন আমার মৃত্যু হবে এবং যে দিন আমাকে পুনরায় জীবিত করে ওঠানো হবে।
হযরত ঈসা আ.-এর সাদৃশ্য হযরত আদম আ. এর মতো
আল্লাহ তা‘আলা হযরত ঈসা আ.- এর সাদৃশ্য দিয়েছেন হযরত আদম আ.- এর সাথে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ آَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ (৫৯)
অর্থ: নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মতো। তাকে মাটি দিয়ে তৈরী করেছিলেন এবং তারপর তাকে বলেছিলেন হয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেন।
হযরত আদম আ. হলেন সর্ব প্রথম মানুষ এবং নবী। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে পিতা-মাতা ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন। এই ঘটনায় কেউ অবাক হয় না অথচ ঈসা আ.-কে সৃষ্টি করা হয়েছে পিতা ছাড়া- এতে আবার আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? এই ঘটনা কি এমন কোনো অনাকাক্সিক্ষত আর আশ্চর্যান্বিত বিষয় যা আল্লাহর কাছে কঠিন ? আল্লাহর কাছে কোনো জিনিসই মুশকিল নয়। কারণ আল্লাহর সুন্নত হলো এই যে, আল্লাহ তায়ালা কোনো জিনিসের ইচ্ছা করেন আর নির্দেশ দেন- হও, সাথে সাথে তা হয়ে যায়। সেই জিনিস অস্তিত্বে চলে আসে। এই সাদৃশ্য ও আয়াত দ্বারা ঐ লোকদেরকে আল্লাহ তা‘আলা বুঝাতে চেয়েছেন যারা হযরত ঈসা আ.- এর পিতা ছাড়া জন্ম হওয়া এবং মারইয়ামকে খারাপ মনে করে ও অপবাদ দেয়। এটা তো কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। এর চেয়ে বেশী অবাক হওয়ার বিষয় হলো হযরত আদম আ.-এর সৃষ্টির মধ্যে। আল্লাহ তা‘আলা যদি পিতা-মাতা ছাড়া সৃষ্টিতে সক্ষম হয়ে থাকেন তাহলে শুধু পিতা ছাড়া সৃষ্টি তো তাঁর কাছে খুবই সহজ ব্যাপার।
হযরত ঈসা আ. বনী ইসরাঈলের নবী ও রাসূল
হযরত ঈসা আ.-কে বনী ইসরাঈলের লোকদের জন্য নবী ও রাসূল বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল। নবী বলা হয় তাকে যিনি পূর্বের শরীয়তের অনুসরণ করেন এবং মানুষকে তার উপর আমল করার দাওয়াত দেন। আর রাসূল বলা হয় তাকে যার ওপর নতুন শরীয়ত অবতীর্ণ হয়। হযরত ঈসা আ. নবীও ছিলেন, রাসূলও ছিলেন। কারণ তাওরাতের সাথে সাথে তাকে নতুন একটি কিতাব ‘ইঞ্জিল’ দেয়া হয়েছিল। বিশেষভাবে তাঁকে বনী ইসরাঈলের প্রতি পাঠানো হয়েছিল। এই বিষয়ে কোরআনের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آَتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا. (৩০)
অর্থ: তিনি বললেন আমি আল্লাহ্র বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন।
সূরা আলে-ইমরানে আল্লাহ তা‘আলা বলেন –

وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ. (৪৮) وَرَسُولًا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآَيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُمْ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنْفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأُحْيِي الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ. (৪৯)
وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بِآَيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ. (৫০) إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ .
অর্থ: আর তাকে তিনি শিখিয়ে দিবেন কিতাব, হিকমত, তওরাত, ইঞ্জিল।
আর বনী ইসরাঈলদের জন্যে রাসূল হিসেবে তাকে মনোনীত করবেন। তিনি বললেন- নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকট তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে এসেছি নিদর্শনসমূহ নিয়ে। আমি তোমাদের জন্য মাটির দ্বারা পাখির আকৃতি তৈরী করে দেই। তারপর তাতে যখন ফুৎকার প্রদান করি, তখন তা আল্লাহ্র হুকুমে উড়ন্ত পাখিতে পরিণত হয়ে যায়। আর আমি সুস্থ করে তুলি জন্মান্ধকে এবং শ্বেত কুষ্ঠ রোগীকে। আর আমি আল্লাহ্র হুকুমে মৃতকে জীবিত করে দেই। আর আমি তোমাদেরকে বলে দেই যা তোমরা খেয়ে আস এবং যা তোমরা ঘরে রেখে আস। এতে প্রকৃত নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।
আর এটি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহকে সত্যায়ন করে। যেমন, তাওরাত। আর তা এজন্য যাতে তোমাদের জন্য হালাল করে দেই কোনো কোনো বস্তু যা তোমাদের জন্য হারাম ছিল। আর আমি তোমাদের নিকট এসেছি তোমাদের পালনকর্তার নিদর্শনসহ। কাজেই আল্লাহ্কে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর।
নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। তাঁর ইবাদত কর, এটাই হলো সরল পথ।
হযরত ঈসা আ.-এর দাওয়াত
হযরত ঈসা আ.-কে শীশুকাল থেকেই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নবুওয়াত ও রিসালাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। বরং তার পূর্বে তার মা মারইয়ামকে তার গুণাবলী, নবুওয়াত ও রিসালাতের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একেবারেই শিশুকালে দোলনায় থাকা অবস্থাতেই তিনি কথা বলেছেন- এটা তাঁর প্রকাশ্য মোজেজা। তিনি যখন বড় হলেন, আর কার্যকরীভাবে নবুওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব এবং ওহীর মাধ্যমে ইঞ্জিল পেলেন, তিনি দাওয়াত ও প্রচারের কাজ শুরু করে দিলেন। তিনি বনী ইসরাঈলকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। দেখুন, সূরা মায়িদায় আল্লাহ তা‘আলা এ ব্যাপারে কী বলেন?
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ (৭২) لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَاثَةٍ وَمَا مِنْ إِلَهٍ إِلَّا إِلَهٌ وَاحِدٌ وَإِنْ لَمْ يَنْتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (৭৩) أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (৭৪) مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ انْظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ الْآَيَاتِ ثُمَّ انْظُرْ أَنَّى يُؤْفَكُونَ (৭৫)
অর্থ.৭২. তারা কাফের যারা বলে যে মারইয়াম-তনয় মসীহ-ই আল্লাহ্; অথচ মসীহ বলেন- হে বণী-ইসরাঈল, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর, যিনি আমার পালন কর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ্ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।
৭৩. নিশ্চয়ই তারা কাফের, যারা বলে আল্লাহ্ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যদি তারা ¯¦ীয় উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের উপর যন্ত¿নাদায়ক শাস্তি পতিত হবে।
৭৪. তারা আল্লাহ্র কাছে তওবা করে না কেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে না কেন? আল্লাহ্ যে ক্ষমাশীল, দয়ালু।
৭৫. মারইয়াম-তনয় মসীহ রাসুল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে অনেক রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছেন আর তার জননী একজন ওলী। তাঁরা উভয়েই খাদ্য ভক্ষণ করতেন। দেখুন! আমি তাদের জন্যে কিরূপ যুক্তি-প্রমাণ বর্ণনা করি। আবার দেখুন! তারা উল্টো কোন দিকে যাচ্ছে ।
হযরত ঈসা আ. একত্ববাদের সাথে তাওরাতের উপর আমল করার দাওয়াত দিতেন।
إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ (৫১)
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ আমারও প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। এটাই সরল পথ যে তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে।
হযরত ঈসা আ.- এর মোজেজা
অন্যান্য নবীদের মধ্যে হযরত ঈসা আ.-কে আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্ন প্রকারের মোজেজা দিয়েছিলেন। যেমন- দোলনাতে থাকা অবস্থায় মানুষের সাথে কথা বলেছেন এবং তাঁকে নতুন কিতাব দিয়েছেন। পাখির আকৃতি তৈরী করে ফুঁক দিলে আল্লাহর হুকুমে তা পাখি হয়ে উড়ে যেত। মৃতকে জীবিত করতে পারতেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-
َرَسُولًا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآَيَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُمْ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنْفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأُحْيِي الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (৪৯)
অর্থ: আর তাঁকে বনী ইসরাঈলের নিকট রাসূল হিসেবে পাঠাবেন। (সে মানুষকে বলবে) আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে নিদর্শন নিয়ে এসেছি (আর সে নিদর্শন এই) যে, আমি তোমাদের সামনে কাদা দ্বারা এক পাখির আকৃতি তৈরি করব, তারপর তাতে ফুঁক দিব। ফলে তা আল্লাহর হুকুমে পাখি হয়ে যাবে এবং আমি আল্লাহ্র হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করে দিব, মৃতদেরকে জীবিত করব এবং তোমরা নিজ গৃহে যা খাও কিংবা মওজুদ কর, তা সব তোমাদেরকে জানিয়ে দিব। তোমাদের জন্য (যথেষ্ট) নিদর্শন রয়েছে।
সূরা মায়েদায় আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-
إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيَّدْتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلًا وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ بِإِذْنِي فَتَنْفُخُ فِيهَا فَتَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِي وَتُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ بِإِذْنِي وَإِذْ تُخْرِجُ الْمَوْتَى بِإِذْنِي وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ (১১০)
অর্থ- যখন আল্লাহ বলবেন: হে ঈসা ইবনে মারইয়াম, তোমার প্রতি ও তোমার মাতার প্রতি আমার অনুগ্রহ স¥রণ কর, যখন আমি তোমাকে পবিত্র আত্মা দ্বারা সাহায্য করেছি। তুমি মানুষের সাথে কথা বলতে কোলে এবং পরিণত বয়সেও এবং যখন আমি তোমাকে কিতাব, প্রগাঢ় জ্ঞান, তাওরাত ও ইঞ্জীল শিক্ষা দিয়েছি এবং যখন তুমি আমার আদেশে কাদামাটি দিয়ে পাখির প্রতিকৃতির মতো প্রতিকৃতি নির্মাণ করতে, অত:পর তুমি তাতে ফুঁ দিতে, ফলে তা আমার আদেশে পাখি হয়ে যেত এবং তুমি আমার আদেশে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করে দিতে এবং যখন আামি বনী-ইসরাঈলকে তোমার থেকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম, যখন তুমি তাদের কাছে প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলে, অতঃপর তাদের মধ্যে যারা কাফের ছিল, তারা বলল- এটা প্রকাশ্য জাদু ছাড়া কিছুই নয়।
إِذْ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (১১২) قَالُوا نُرِيدُ أَنْ نَأْكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنَّ قُلُوبُنَا وَنَعْلَمَ أَنْ قَدْ صَدَقْتَنَا وَنَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ الشَّاهِدِينَ (১১৩) قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِأَوَّلِنَا وَآَخِرِنَا وَآَيَةً مِنْكَ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيرُ الرَّازِقِينَ (১১৪) قَالَ اللَّهُ إِنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ فَمَنْ يَكْفُرْ بَعْدُ مِنْكُمْ فَإِنِّي أُعَذِّبُهُ عَذَابًا لَا أُعَذِّبُهُ أَحَدًا مِنَ الْعَالَمِينَ (১১৫)
অর্থ: ১১১. আর যখন আমি হাওয়ারীদের মনে জাগ্রত করলাম যে, আমার প্রতি এবং আমার রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তখন তারা বলতে লাগল, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা অনুগত।
১১২. যখন হাওয়ারীরা বলল: হে মারইয়াম তনয় ঈসা, আপনার পালনকর্তা কি এরূপ করতে পারেন যে, আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চা অবতরণ করে দিবেন? তিনি বললেন: যদি তোমরা ঈমানদার হও, তবে আল্লাহ্কে ভয় কর।
১১৩. তারা বলল: আমরা তা থেকে খেতে চাই; আমাদের অন্তর পরিতৃপ্ত হবে; আমরা জেনে নেবো যে, আপনি সত্য বলেছেন এবং আমরা সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাব।
১১৪. ঈসা ইবনে মারইয়াম বললেন: হে আল্লাহ্, আমাদের পালনকর্তা আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্যে পরিপূর্ণ খাঞ্চা অবতরণ করুন। তা আমাদের জন্যে অর্থাৎ, আমাদের প্রথম ও পরবর্তী সবার জন্যে আনন্দোৎসব হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আপনি আমাদের রূজির ব্যবস্থা করে দিন। আপনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।
১১৫. আল্লাহ্ বললেন: নিশ্চয়ই আমি সে খাঞ্চা তোমাদের প্রতি অবতরণ করব। অত:পর যে ব্যক্তি এর পরেও অকৃতজ্ঞ হবে, আমি তাকে এমন শাস্তি দেব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অন্য কাউকে দেব না।
হযরত ঈসা আ.-এর ব্যাপারে দুই গ্রুপ
হযরত ঈসা আ. যখন বনী ইসরাঈলের সামনে স্পষ্টভাবে প্রকাশ্যে দাওয়াত পেশ করলেন এবং সঠিক পথে আসার ও বলার জন্য দাওয়াত দিতে লাগলেন, বনী ইসরাঈলেরা তখন দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেল।
এক দল তো হযরত ঈসা আ.-কে নবী ও রাসূল হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল, এবং তার সঙ্গ দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একটি বিশেষ দল ছিল যারা তার বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা অধিকাংশ সময় হযরত ঈসা আ.-এর সাথে থেকে দাওয়াত ও প্রচারের কাজ করতেন। তাদেরকে হাওয়ারিন বলা হয়। দেখুন, আল্লাহ তা‘আলা সূরা আলে-ইমরানে কী বলেন-
فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِي إِلَى اللَّهِ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللَّهِ آَمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ (৫২) رَبَّنَا آَمَنَّا بِمَا أَنْزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ (৫৩
অর্থ: ৫২ অত:পর হযরত ঈসা (আ:) যখন বনী ইসরাঈলের কুফরী স¤পর্কে উপলব্ধি করতে পারলেন, তখন বললেন- কারা আল্লাহ্র পথে আছে যারা আমাকে সাহায্য করবে? সঙ্গী-সাথীরা বললো, আমরা রয়েছি আল্লাহ্র পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহ্র প্রতি ঈমান এনেছি। আর তুমি সাক্ষী থাক যে, আমরা হুকুম কবুল করে নিয়েছি।
৫৩. হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা সে বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি যা তুমি নাযিল করেছ। আমরা রসূলের অনুগত হয়েছি। অতএব, আমাদিগকে মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নাও।
দ্বিতীয় দল ছিল যারা কাফের অর্থাৎ অবিশ্বাসী । এই দলটি অনেক আগে থেকেই হযরত ঈসা (আ:) -এর মাতার ব্যাপারে অপবাদ দিয়েছিল, ফলে তাদের আর ইসলাম গ্রহণ করার সুযোগ হলো না এবং ইসলামের মোজেজাকে জাদু বলে আখ্যা দিতে লাগলো। দেখুন, আল্লাহ তা‘আলা কী বলে-
فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ (১১০)
অর্থ: অতঃপর কাফেররা বলল এটা প্রাকাশ্য জাদু।

তাদের দুশমন ও শত্রুতা এই পর্যায়ের পৌঁছল তারা হযরত ঈসা আ. কে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত ছিলো। আর সে সময়ের রোমীয় বাদশাও শুলিতে চড়ানোর নির্দেশ জারি করে। আল্লাহ তা‘আলা জীবিত অবস্থায় হযরত ইসা আ.-কে আকাশে উঠিয়ে নিলেন, আর তারই এক হাওয়ারিনকে তার চেহারা বানিয়ে দিলেন, আর সেই হাওয়ারিনকে শুলিতে চড়ানো হলো।
হযরত ঈসা আ.- এর ব্যপারে খ্রিস্টানদের বিশ^াস
হযরত ঈসা আ.-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর তার হাওয়ারীরা গোপণে গোপনে প্রচারের কাজ চালাচ্ছিলেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে তা প্রচার-প্রসারও নিষিদ্ধ ছিল। প্রায় তিনশত বছর পর তারা প্রকাশ্যে প্রচার করা শুরু করে। তখন তাদের কাছে সেই ইঞ্জিলও ছিল না। তার হাওয়ারিনগণ স্মৃতিশক্তি হতে যা মনে ছিল তা লিখে রেখেছিল, সেগুলোকে ইঞ্জিল বলা হয়। এর বহু বছর পর তাদের আকিদা-বিশ^াসের মধ্যে মতানৈক্য হয়ে গেল। আস্তে আস্তে শয়তান তাদেরকে সঠিক বিশ^াস থেকে সরিয়ে শিরক ও কুফরি বিশ^াস এর প্রতি উৎসাহ দিয়েছিল।
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের বিশ^াস উল্লেখ করে তার খন্ডন করেছেন।
প্রথম বিশ^াস- হযরত ঈসা আল্লাহ
খ্রিস্টানরা বিশ^াস করে হযরত ঈসা আ. আল্লাহ্। কুরআন তা খন্ডন করেছে। আল্লাহ্ তা‘আলা সূরা মায়েদায় বলেনÑ
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ (৭২)
অর্থ: তারা কাফের যারা বলে যে মারইয়াম-তনয় মসীহ-ই আল্লাহ্; অথচ মসীহ বলেন- হে বনী-ইসরাঈল, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর যিনি আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ্ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।
দ্বিতীয় বিশ^াস- হযরত ঈসা আ. আল্লাহ্র পুত্র
খ্রিস্টানরা বিশ^াস করে হযরত ঈসা আ. আল্লাহ্র পুত্র। তাদের এই বিশ্বাসকে খ-ন করে আল্লাহ তা‘আলা সূরা তাওবায় বলেনÑ
وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ (৩০)

অর্থ. নাসারারা বলে ;মসীহ আল্লাহ্র পুত্র’। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ্ এদের ধ¦ংস করুন, এরা কোন বিপরীত পথে চলে যাচ্ছে ।

তৃতীয় বিশ^াস- হযরত ঈসা আ. তিনজনের তৃতীয় জন।
খ্রিস্টানরা বিশ^াস করে- আল্লাহ তিনজন । ১. (পিতা)-আল্লাহ। ২. (পুত্র)-ঈসা ইবনে মারইয়াম। ৩. (পবিত্র আত্মা)-রুহুল কুদ্দুুস (জিব্রাইল)।
আল্লাহ তা‘আলা তাদের এই বিশ^াসকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন-
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَاثَةٍ وَمَا مِنْ إِلَهٍ إِلَّا إِلَهٌ وَاحِدٌ وَإِنْ لَمْ يَنْتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (৭৩)
অর্থ: ৭৩. নিশ্চয়ই তারা কাফের যারা বলে আল্লাহ্ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যদি তারা ¯¦ীয় উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে।
কোরআনে আরো ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ (৫১)
অর্থ- নিশ্চয়ই আল্লাহ আমারও প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। এটাই সরল পথ যে তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে।
৪র্থ বিশ^াস- প্রায়শ্চিত্ব
খ্রিস্টানদের বিশ^াস হযরত ঈসা আ. শূলিতে চড়ে সকলের পাপকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কুরানুল কারীমে তাদের এই বিশ্বাসকে খন্ডন করে সূরা নিসায় আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا (১৫৭)
অর্থ: ১৫৭. আর তাদের একথা বলার কারণে যে, আমরা মারইয়াম পুত্র ঈসা মসীহ্কে হত্যা করেছি যিনি ছিলেন আল্লাহ্র রসূল। অথচ তারা না তাঁকে হত্যা করেছে, আর না শূলীতে চড়িয়েছে, বরং তারা এরূপ ধাঁধায় পতিত হয়েছিল। বস্তুত: তারা এ ব্যাপারে নানা রকম কথা বলে। তারা এক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে। শুধুমাত্র অনুুমান করা ছাড়া তারা এ বিষয়ে কোনো খবরই রাখে না। আর নিশ্চয়ই তারা তাঁকে হত্যা করেনি।

একজনের পাপের কারণে অন্য জনকে শাস্তি দেয়া হয় না। এবিষয়ে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন-
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِنْ تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى إِنَّمَا تُنْذِرُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَمَنْ تَزَكَّى فَإِنَّمَا يَتَزَكَّى لِنَفْسِهِ وَإِلَى
اللَّهِ الْمَصِيرُ (১৮)
অর্থ: ১৮. কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কেউ যদি তার গুরুতর ভার বহন করতে অন্যকে আহ্বান করে কেউ তা বহন করবে না-যদি সে নিকটবর্তী আতœীয়ও হয়। আপনি কেবল তাদেরকে সতর্ক করেন, যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখেও ভয় করে এবং নামায কায়েম করে। যে কেউ নিজের সংশোধন করে, সে সংশোধন করে ¯¦ীয় কল্যাণের জন্যই। নিশ্চয়ই আল্লাহ্র নিকটই সকলের প্রত্যাবর্তন।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ (৭) وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ (৮)
অর্থ.৭.অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে ।
৮ .এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।
খ্রিস্টানদের জন্য আল্লাহর সতর্কবাণী
আল্লাহ তা‘আলা খ্রিস্টানদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন- তোমরা ভুল পথ ছেড়ে দাও এবং সঠিক পথে চলে আসো
খ্রিস্টানদের ব্যাপারে হযরত ঈসা আ.-কে আল্লাহ্র জিজ্ঞাসা
কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা‘আলা হযরত ঈসা আ.-কে জিজ্ঞাসা করবেন। প্রিয় পাঠক বৃন্দ দেখুন আল্লাহ তা‘আলা কী জিজ্ঞাসা করেন আর হযরত ঈসা আ. কী উত্তর দেন-
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ (১১৬) مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ (১১৭)

অর্থ:১১৬. যখন আল্লাহ্ তাআলা বলবেন: হে ঈসা ইবনে মারইয়াম! তুমি কি লোকদেরকে বলে দিয়েছিলে যে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মাতাকে উপাস্য সাব্যস্ত কর? ঈসা বলবেন; আপনি পবিত্র! আমার জন্য শোভা পায় না যে, আমি এমন কথা বলি, যা বলার কোনো অধিকার আমার নেই। যদি আমি বলে থাকি, তবে আপনি অবশ্যই পরিজ্ঞাত; আপনি তো আমার মনের কথাও জানেন এবং আমি জানি না যা আপনার মনে আছে। নিশ্চয়ই আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত।
১১৭. আমি তো তাদেরকে কিছ্ইু বলিনি, শুধু সে কথাই বলেছি যা আপনি বলতে আদেশ করেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্র দাসত্ব অবল¤¦ন কর যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা আমি তাদের স¤পর্কে অবগত ছিলাম যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে লোকান্তরিত করলেন, তখন থেকে আপনিই তাদের স¤পর্কে অবগত রয়েছেন। আপনি সর্ববিষয়ে পূর্ণ পরিজ্ঞাত।
ঈসা আ.- এর ব্যপারে ইহুদীদের বিশ^াস
হযরত ঈসা আ.- এর আগমনের পর বনী ইসরাঈল দুই দলে বিভক্ত হলো। হযরত ঈসা আ.- এর যুগে তার অনুসারীদেরকে হাওয়ারিন বলা হতো। আর এক দল যারা হযরত ইসা আ.-কে অস্বীকার করত। তার উপর বিভিন্ন অপবাদ দিত। তাওরাতে হযরত ঈসা আ.-এর ব্যাপারে যেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তার অপব্যাখ্যা দিত।
মারইয়ামের প্রতি অপবাদ
ইহুদীরা হযরত মারইয়াম আ. -কে অপবাদ দিল যে, মারইয়াম ইউসুফ নামক এক ব্যাক্তির সাথে ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
وَبِكُفْرِهِمْ وَقَوْلِهِمْ عَلَى مَرْيَمَ بُهْتَانًا عَظِيمًا (১৫৬)
অর্থ: আর তাদের কুফরী মারইয়ামের প্রতি মহা অপবাদ আরোপ করার কারণে।
আল্লাহ তা‘আলা তাদের বিশ্বাস এভাবে খন্ডন করে –
مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ انْظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ الْآَيَاتِ ثُمَّ انْظُرْ أَنَّى يُؤْفَكُونَ (৭৫)
অর্থ: মসীহ্ ইবনে মারইয়াম তো একজন রাসূলই ছিলেন, তার বেশি কিছু নয়। তার পূর্বেও বহু রাসূল গত হয়েছে। তার মা ছিলেন সত্যবাদী। তারা উভয়ে খাবার খেত। দেখ, আমি তাদের সামনে নিদর্শনাবলী কেমন সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করছি। তারপর এটাও দেখ যে, তাদেরকে উল্টোমুখে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ইহুদী-খ্রিস্টান তথা আহলে কিতাবদের প্রতি সতর্কবাণী
আল্লাহ তাআলা ইহুদী-খ্রিস্টানদেরকে সকর্ত করে বলেন,
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ فَآَمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ انْتَهُوا خَيْرًا لَكُمْ إِنَّمَا اللَّهُ إِلَهٌ وَاحِدٌ سُبْحَانَهُ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا (১৭১) لَنْ يَسْتَنْكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْدًا لِلَّهِ وَلَا الْمَلَائِكَةُ الْمُقَرَّبُونَ وَمَنْ يَسْتَنْكِفْ عَنْ عِبَادَتِهِ وَيَسْتَكْبِرْ فَسَيَحْشُرُهُمْ إِلَيْهِ جَمِيعًا (১৭২) فَأَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَيُوَفِّيهِمْ أُجُورَهُمْ وَيَزِيدُهُمْ مِنْ فَضْلِهِ وَأَمَّا الَّذِينَ اسْتَنْكَفُوا وَاسْتَكْبَرُوا فَيُعَذِّبُهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا وَلَا يَجِدُونَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا (১৭৩)
অর্থ: ১৭১. হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহ্র শানে নিতান্ত সঙ্গত বিষয় ছাড়া কোনো কথা বলো না। নি:সন্দেহে মারইয়াম পুত্র মসীহ্ ঈসা আল্লাহ্র রসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি প্রেরণ করেছেন মারইয়ামের নিকট এবং রূহ-তাঁরই কাছ থেকে আগত। অতএব, তোমরা আল্লাহ্কে এবং তাঁর রসূলগণকে মান্য কর। আর একথা বলো না যে, আল্লাহ্ তিনের এক; একথা পরিহার কর, তোমাদের মঙ্গল হবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ একক উপাস্য। সন্তান-সন্তুতি হওয়াটা তাঁর শানের যোগ্য বিষয় নয়। যা কিছু আসমানসমূহ ও যমীনে রয়েছে সবই তাঁর। আর কর্মবিধানে আল্লাহ্ই যথেষ্ট।
১৭২. মসীহ আল্লাহ্র বান্দা হবেন, তাতে তার কোনো লজ্জাবোধ নেই এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাদেরও না। বস্তুত: যারা আল্লাহ্র দাসত্বে লজ্জাবোধ করবে এবং অহংকার করবে তিনি তাদের সবাইকে নিজের কাছে একত্রিত করবেন।
১৭৩. অতঃপর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তিনি তাদেরকে পরিপূর্ণ সওয়াব দান করবেন, বরং ¯¦ীয় অনুগ্রহে আরো বেশী দিবেন। পক্ষান্তরে যারা লজ্জাবোধ করেছে এবং অহঙ্কার করেছে তিনি তাদেরকে দেবেন বেদনাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ্কে ছাড়া তারা কোনো সাহায্যকারী ও সমর্থক পাবে না।

তাদের এই ভুল বিশ^াস ত্যাগ না করার কারণে কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
وَإِنْ لَمْ يَنْتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (৭৩)
অর্থ: আর যদি তারা ¯¦ীয় উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে।

অন্য আয়াতে সকল আহলে কিতাবদেরকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে।
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ (৬৪)
অর্থ: বলুন, হে আহ্লে কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আসো যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে একই- আমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবো না, তাঁর সাথে কোনো শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহ্কে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপরও যদি তারা ¯¦ীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, তোমরা সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত।
খ্রিস্টবাদ এবং ইসলাম
হযরত মারইয়াম আ.- এর ব্যাপারে মুসলমানদের বিশ্বাস
হযরত মারইয়াম আ.-এর ব্যাপারে মুসলমানদের বিশ্বাস হলো- তিনি আল্লাহর ওলীয়া ছিলেন। সত্যবাদী পবিত্রা মহিলা ছিলেন। যাকে আল্লাহ তাআলা তার ইবাদতের জন্য কবুল করেছিলেন। আল্লাহ তাকে একজন বড় নবীর মা হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন। তিনি দুনিয়াতে ৪ জন সম্মানিতা নারীদের অন্যতম। যাদের মর্যাদা আল্লাহর নিকট অন্যান্য নারীদের থেকে অনেক বেশী।
এতদ সত্ত্বেও তারা মানুষ ছিলেন। এর থেকে বাড়াবাড়ি-ছড়াছড়ি করা ঠিক না। খ্রিস্টানরা তাঁকে স্বস্থান হতে সরিয়ে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে যা সঠিক না। আর ইহুদীরা তা কমিয়ে অপবাদ দিয়ে দিয়েছে। যা একেবারেই ভ্রান্ত। আর ইসলাম তার প্রতিবাদ করেছে।
আল্লাহ্ বলেন . وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌতার মা সতী ছিলেন।
হযরত ঈসা আ.- এর ব্যাপারে মুসলমানদের বিশ্বাস
হযরত ঈসা আ.-এর ব্যাপারে মুসলমানদের আকিদা ও বিশ্বাস হলো তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল ছিলেন।
তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন অলৌকিক ভাবে। আল্লাহ্ তাকে নবী ও রাসূল বানিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন তার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী অবতীর্ণ হয়েছিল। তাকে আসমানী বড় চার কিতাবের মধ্যে ইঞ্জিল শরীফ দান করেছেন।
তাঁকে আল্লাহ কিছু অলৌকিক শক্তি দিয়েছিলেন। যা না তার পূর্বে কাউকে দেওয়া হয়েছিল, না তার পরে কাউকে। তিনি মাটি দিয়ে পাখি বানিয়ে ফুঁক দিলে আল্লাহর হুকুমে জানদার হয়ে উড়ে যেত। তিনি জন্মান্ধকে আল্লাহর হুকুমে একেবারে সুস্থ করে দিতেন। আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করে দিতেন।
কিন্তু এত মর্যাদা, নবী-রাসূল ও মোজেজা থাকার পরেও তিনি মানুষ-ই ছিলেন। আল্লাহও নয় , তার ছেলেও নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ (৭২) لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَاثَةٍ وَمَا مِنْ إِلَهٍ إِلَّا إِلَهٌ وَاحِدٌ وَإِنْ لَمْ يَنْتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (৭৩) أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (৭৪) مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلَانِ الطَّعَامَ انْظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ الْآَيَاتِ ثُمَّ انْظُرْ أَنَّى يُؤْفَكُونَ (৭৫)
অর্থ.৭২ ) তারা কাফের, যারা বলে যে, মারয়াম -তনয় মসীহ-ই আল্লাহ্; অথচ মসীহ বলেন- হে বনী-ইসরাঈল, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর যিনি আমার পালন কর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ্ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।
৭৩. নিশ্চয়ই তারা কাফের যারা বলে আল্লাহ্ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যদি তারা ¯¦ীয় উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পতিত হবে।
৭৪. তারা আল্লাহ্র কাছে তওবা করে না কেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে না কেন? আল্লাহ্ যে অতীব ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু।
৭৫. মারইয়াম-তনয় মসীহ রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে অনেক রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছেন আর তার জননী একজন আল্লাহর ওলী। তাঁরা উভয়েই খাদ্য ভক্ষণ করতেন। দেখুন, আমি তাদের জন্যে কিরূপ যুক্তি-প্রমাণ বর্ণনা করি। আবার দেখুন, তারা উল্টো কোন দিকে যাচ্ছে।
শূলে চড়ানোর প্রকৃত ঘটনা
ইহুদী ও খ্রিস্টানদের বিশ্বাস হলো, তাকে শুলিতে দেওয়া হয়েছে। খ্রিস্টানরা মনে করে তিনি গুনাহর কাফফারা হিসেবে শুলিতে চড়েছেন। আর ইহুদীরা মনে করে তাকে শাস্তি হিসাবে শুলিতে চড়ানো হয়েছে। আর মুসলমানদের বিশ্বাস হলো- না তাঁকে শুলিতে চড়ানো হয়েছে আর না হত্যা করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন–
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا.
অর্থ-আর তারা বলে, আমরা অল্লাহর রাসূল ঈসা ইবনে মারইয়ামকে হত্যা করেছি। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং শূলেও চড়াতে পারেনি; বরং তাদের বিভ্রম হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে যারা এ সম্পর্কে মতভেদ করেছে, তারা এ বিষয়ে সংশয়ে নিপতিত এবং এ বিষয়ে অনুমানের অনুসরণ ছাড়া তাদের প্রকৃত কোনোও জ্ঞান ছিল না। সত্য কথা হচ্ছে- তারা হযরত ঈসা আ.-কে হত্যা করেনি।
প্রকৃত ঘটনা হলো, সেই সময় ফিলিস্তিনে রোমীয় সরকার ইহুদীদেরকে ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিয়ে রেখেছিল, কিন্তু শাস্তি প্রয়োগ আদালতের মাধ্যমেই হতো। ফলে প্রথমে ইহুদীদের ধর্মীয় আদালতে হযরত ঈসা আ.-কে এলহাদের (ধর্ম পরিবর্তন করার) অপবাদ দিয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, আর রাষ্ট্রীয় আদালতে দেশদ্রোহী ও বিশৃঙ্খলাকারীর অপবাদ দিয়ে শূলে চড়ানোর হুকুম জারি করেছিল। ইহুদীরা যখন এসব কর্মকা- করছিল,

তখন আল্লাহ্ তা‘আলা ওহীর মাধ্যমে হযরত ঈসা আ.-কে পুরো চক্রান্তের খবর দিয়ে দিলেন। ফলে হযরত ঈসা আ. তাঁর সকল হাওয়ারিনদেরকে বললেন- তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে আমার স্থানে কুরবানী দিতে প্রস্তুত? যাকে আমার মতো আকৃতি করে দেওয়া হবে? সে কুরবানী দিয়ে পরে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। এক যুবক বললেন, আমি এর জন্য প্রস্তুত। এরপর হযরত ঈসা আ.- কে স্বশরীরে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হলো।
ইহুদীদের টার্গেট অনুযায়ী রোমীয় সেনা যারা সেই হাওয়ারীকে ধরে নিয়ে গেল ও তাকে শুলিতে চড়িয়ে দিল। তারা মনে করল, আমরা ঘযরত ঈসা আ.-কে শুলিতে চড়িয়েছি। এই ঘটনার পর ইহুদীরা সেই শুলির কথা বলছিল। যদিও অন্য দল বুঝেছিল যাকে শূলিতে চড়ানো হলো তিনি ঈসা আ. ছিলেন না। কিছু লোক তো হযরত ঈসা আ.-কে আকাশে উঠে যেতে দেখেছেন।
খ্রিস্টবাদের শুরুর দিকে অনেক দল ছিল যারা হযরত ঈসা আ.-এর আল্লাহ্ হওয়া ও শূলিতে চড়ানোর বিষয়টি বিশ্বাস করতো না। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লামের যুগে হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশী ও হযরত ঈসা আ.-এর আল্লাহ হওয়া ও শুলিতে চড়ানোয় বিশ্বাসী ছিলেন না।
কেয়ামতের পূর্বে হযরত ঈসা আ.-এর আবির্ভাব
কুরআন-হাদীসের আলোকে মুসলমানদের বিশ্বাস হল, আল্লাহ তা‘আলা আপন শক্তিতে হযরত ঈসা আ.- কে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। কেয়ামতের পূর্বে তিনি দামেস্কের জামে মসজিদের পূর্ব দিকে মিনার দিয়ে ফজরের নামাজের জন্য একামতের সময় নেমে আসবেন। শুকরকে হত্যা করবেন, ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন। জিজিয়া কর ক্ষমা করে দিবেন। তার সময় বহু মানুষ মুসলমান হয়ে যাবে। দাজ্জাল ও তার সহযোগী ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করবেন এবং দাজ্জালকে নিজ হাতে হত্যা করবেন। তাঁর যুগেই ইয়াজুজ মাজুজের প্রকাশ হবে। তিনি চল্লিশ বছর জীবিত থাকবেন, বিবাহ করবেন। এরপর মৃত্যুবরণ করবেন এবং মদীনা মুনাওয়ারায় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লামের পাশে তার দাফন করা হবে। সেখানে তাঁর জন্য কবরের স্থান রেখে দেয়া হয়েছে। রাসূল স সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিভিন্ন হাদিস দ্বারা এটি প্রমাণিত হয় যে, হযরত ঈসা আ. আকাশে জীবিত আছেন এবং কেয়ামতের পূর্বে দুনিয়াতে আসবেন।
এক হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- ঐ সত্ত্বার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, এমন এক সময় আসবে যখন তোমাদের মধ্যে ইবনে মারইয়াম হাকিম ও ইনসাফকারী হিসাবে দুনিয়াতে আসবেন। তিনি ক্রুশকে ভেঙ্গে ফেলবেন, শুকরকে হত্যা করবেন, জিজিয়া কর উঠিয়ে দিবেন। সে সময়ে সম্পদের পরিমাণ এত বেড়ে যাবে যে, সম্পদ গ্রহণকারী কেউ থাকবে না। হযরত ঈসা আ. সকল ধর্ম শেষ করে দিবেন। তখন ইসলাম বিজয়ী হবে।

অধমের আহ্বান
প্রিয় ভাই ও বোন! আমি আপনাদেরকে অন্তর থেকে ভালো বাসি। আপনাদের জন্য আমার হৃদয়টি ছট ফট করে। আপনরা যেন অনেক ভালো কাজ করার পরও চিরস্থায়ী নরকে না জ্বলেন। তাই আপনাদের সামনে আপনাদের প্রভুর পক্ষ থেকে আসা আল কুরআন থেকে যীশু ও তার মাতার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরলাম। পেশ করলাম তাঁর শিক্ষা। আল্লাহর এই বাণীগুলো মন দিয়ে পাঠকরুন এবং আমল করুন। মন থেকে আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি, আপনি মুসলমান হয়ে চিরস্থায়ী নরকের আগুন থেকে বেঁচে যান। ভাইয়া! আমি চাই না। আপনি কঠিন আগুনে চিরদিন জ্বলুন। দেখুন! আপনি যদি মুসলমান হোন, তাহলে আমার কোনো লাভ নেই। আপনি আমাকে একটি টাকাও দিবেন না। শুধু আপনার ভালোবাসার কারণেই আমি আপনাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছি। আপনার ভাইটির দাওয়াতটি গ্রহণ করে তার অন্তরকে সান্ত¡না দিন।
সত্যি বলছি, ভাইয়া! আপনাদের জন্য আমার মনটা খুব কাঁদছে। যাতে আপারা নরক থেকে মুক্তি পেয়ে চিরস্থায়ী স্বর্গের বাসিন্দা হয়ে যান। ভাইয়া শেষ বারের মতো আহ্বান করছি। আপনি মুসলমান হয়ে যান, মুসলমান হয়ে যান, মুসলমান হয়ে যান। না হয় কমপক্ষে আপনার এক মালিককে বলুন, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সত্য পথ দেখান এবং দেখার সাথে সাথে তা গ্রহণ করার তৌফিক দান করুন। আর সকাল সন্ধা বলুন ,‘‘ ইয়া হাদী, ইয়া রাহীম’’। সকালে ১০০বার, বিকালে ১০০বার। সর্বশেষ দুআ করি হে আল্লাহ! আমাদের প্রত্যেকটি ভাই-বোনকে ইসলামের সঠিক পথ দান করুন! আমীন। হে আল্লাহ! আপানার বান্দাকে আপনার সাথে জুড়িয়ে নিন। আপনার বান্দাকে নরকের কঠিন আগুনে নিক্ষেপ করিবেন না। হে আল্লাহ! এই পুস্তিকাটি বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সমস্ত মানুষের হেদায়াতের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন!
সমাপ্ত

মুফতি যুবায়ের আহমদ