হযরত মুসা আ.-এর ঘটনা

একটু ভাবুন হযরত মুসা আ.কে দা‘য়ী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। মুসা আ. আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতার অভিযোগ করলেন, বললেন-

قَالَ رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي . وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي. وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي . يَفْقَهُوا قَوْلِي. وَاجْعَل لِّي وَزِيرًا مِّنْ أَهْلِي.  هَارُونَ أَخِي . اشْدُدْ بِهِ أَزْرِي. وَأَشْرِكْهُ فِي أَمْرِي.

মূসা বললেন: হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। এবং আমার পরিবারবর্গের মধ্য থেকে আমার একজন সাহায্যকারী করে দিন। আমার ভাই হারুকে। তার মাধ্যমে আমার কোমর মজবুত করুন।  এবং তাকে আমার কাজে অংশীদার করুন।   

নিজের দায়িত্ব আদায় ও হুকুম পালনের জন্য মুসা আ. নিজের ভাইয়ের জন্য নবুওয়াতের দুআ করলেন এবং দাওয়াতের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনের কথা বললেন। আল্লাহ তাআলা উত্তর দিলেন-

{قَالَ قَدْ أُوتِيتَ سُؤْلَكَ يَا مُوسَى } [طه : ৩৬]

আল্লাহ বললেন: হে মূসা! তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেয়া হলো।  

এর দ্বারা বোঝা গেল, দায়ীর সম্মান বৃদ্ধি ও তার কঠিন কঠিন অসম্ভব চাহিদাকেও পূরণ করা হয়। যখন ওখান থেকে দান করা হয়, তখন কোনো সমস্যা আর ওয়াসায়েল ও মাধ্যমের স্বল্পতার কথা কোত্থেকে আসে? সর্বক্ষেত্রে গায়েবী সাহায্যের ঘটনা সামনে আসে।

বিভিন্ন সমস্যার ভয়

শয়তান দায়ীর অন্তরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার ওয়াসওয়াসা ঢালতে থাকে। কোনো সিআইডির চক্করে না পড়ি, না জানি কোনো ইসলাম দুশমন শক্তি জেনে ফেলে। না জানি মানুষ আমার জান হরণের পেছনে লেগে যায়। এর জন্য আমরা নিজে কালেমা পড়াতেও ভয় পাই। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। এক মুসলমান মেয়ে অমুসলিম একটি ছেলেকে মুসলমান বানিয়ে বিয়ে করবে। এর জন্য বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের কাছে ঘোরাফেরা করেছে। কেউ তাদেরকে কালেমা পড়িয়ে বিয়ে দিয়ে দিতে রাজি হয়নি। ছেলে বলল, এখন তো তোমাদের লোকদের থেকে নিরাশ হয়ে গিয়েছি, চল আমরা হিন্দু হয়ে যাই। বাধ্য হয়ে মেয়ে হিন্দু হতে প্রস্তুত হয়ে যায়। এক মন্দিরের পূজারী তাদেরকে হিন্দু বানিয়ে বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমরা কুরআনে কারীমের ঘোষণা ভুলে গিয়েছি। আল্লাহ তাআলা বলেন-

{ الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيبًا} [الأحزاب : ৩৯]

সেই নবীগণ আল্লাহর পয়গাম প্রচার করতেন ও তাকে ভয় করতেন। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করতেন না। হিসাব গ্রহণের জন্যে আল্লাহ যথেষ্ট। 

আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছেন-

{يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ} [المائدة : ৬৭]

হে রাসূল! পৌছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তার পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। 

নবীর অনুসরণকারী রেসালাতের দায়িত্ব পালনকারীর জন্য আল্লাহর হেফাজত কি যথেষ্ট নয়?

হাকীম খাবীর আল্লাহ তাআলা যার হেফাজতের জিম্মাদারী নিয়েছেন কে তার ক্ষতি করতে পারবে? এই জন্য দায়ীর উচিত সে তার অন্তরে কোনো ধরনের শঙ্কা ও ক্ষতির চিন্তাকে স্থান দেবে না।

অধিক গোপনীয়তা দাওয়াতী কাজে বাধা

দাওয়াতী কাজে একটি বাধা হলো এখলাসের নামে অধিক গোপনীয়তা। তাবলিগের কাজই হলো প্রচারমূলক একটি কাজ। পুরো মানবতার মধ্যে এই প্রচারই কাম্য। তাই দীনের প্রচার-প্রসার গোপনীয়তার মধ্যে সম্ভব নয়।

   বাস্তবতা হলো, গোপনীয়তার মধ্যে গাইরুল্লাহর ভয় লুকিয়ে থাকে। কেউ যেন আমার দুশমন না হয়ে যায়। কেউ যেন আমার জীবনের হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়। সর্বদা এ ধরনের ভয় পেছনে লেগে থাকে। দাওয়াতী কাজ মূলত চায় উৎসাহ ও কুরবানী। দাওয়াতের কাজ হলো রেসালাতের কাজ। আর রেসালাতের কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ পেরেশানী, ভয় কুরবানীর জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। এই পথে অস্থিরতা, ভয়ভীতি, মসিবত সাধনার পথে ওই হাদিয়া, উপঢৌকন, যার কারণে আমরা আমাদের বড়দের এবং খাইরুল কুরুনের সৌভাগ্যবান সাহাবা বরং বুযুর্গদেরকে খুব সম্মানের সাথে স্মরণ করি। তাই দা‘য়ীর গাইরুল্লাহ থেকে নির্ভীক হয়ে এই পথে পা রাখতে হবে। আল্লাহর এই বাণী কি আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়?

{ الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيبًا} [الأحزاب : ৩৯]

‘সেই নবীগণ আল্লাহর পয়গাম প্রচার করতেন ও তাকে ভয় করতেন। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করতেন না। হিসাব গ্রহণের জন্যে আল্লাহ যথেষ্ট।’

বাস্তবতা হলো, এই যুগে আমাদের দুর্বলতা এবং হীনম্মন্যতার কারণে আল্লাহ তাআলা তার ওয়াদা وكفى بالله حسيبا  অনুযায়ী দায়ীদেরকে তাদের মুসিবত ও পেরেশানি থেকে হেফাজত করেন। তাই গাইরুল্লাহর ভয় অন্তর থেকে বের করে, হিম্মত ও সংগ্রামের সবকিছু মেনে নিয়ে সকল প্রকারের কুরবানী দেওয়ার নিয়ত দায়ীর থাকতে হবে, এসব কিছু জেনে বুঝেই এই দাওয়াতী পথে পা রাখতে হবে।

হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেব

অনুবাদ: মুফতি যুবায়ের আহমদ