হাকীম আব্দুর রহমান (অমিত কুমার)-এর সাক্ষাৎকার

লোকজন আমাকে এ প্রশ্নটিই করে যে, কোন্ বিষয়টি আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছে? আমি মানুষকে বলি, বলুন তো ইসলামের মধ্যে এমন কোন বিষয়টি আছে যা মানুষকে প্রভাবিত করে না? যেমন- সুন্নাতী পোশাক। চেহারায় দাড়ি। পাঁচ ওয়াক্ত নামায। তাছাড়া ঈমানদারদের পারস্পরিক লেনদেন, আচার-আচরণ, পরস্পরে একসঙ্গে বসে খানাপিনা করা- ভ্রাতৃত্বের এমন উদাহরণ আর কোথায় আছে? এ সবকিছুই আমাকে প্রভাবিত করেছে, একই ঘরে লালিত-পালিত মা-বাবা এবং ছেলে মেয়েরা যেখানে একজনের পান করা পানি অপর জন পান করেনা। একজনের গ্লাসে অপরজন মুখ লাগায় না। এমন কি আমার পিতা আমার গ্লাসে পানি পর্যন্ত পান করতেন না। সেখানে মুসলমানগণ আরেকজন অচেনা মুসলমানের সঙ্গে বসে কত নিবিড়ভাবে খানা খাচ্ছে। আমি আমার বাবার কথাই বলবো। তিনি কখনও আমার পানি খাওয়া গ্লাসে পানি খেতেন না। এমনকি আমিও তার গ্লাসে কখনও মুখ লাগাতাম না। এসব বিষয়ই আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। সেগুলো দেখেই আমি মুসলমান হয়েছি।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আবদুর রহমান: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহ: আব্দুর রহমান ভাই! দীর্ঘদিন যাবত আরমুগানে নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার ছাপা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের সাধারণ পাঠকদের নিকট নওমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের কাহিনী তুলে ধরছি। উদ্দেশ্য হলো- এসব কাহিনী শুনে যেন মুসলমানদের ভেতর ইসলামী চেতনাবোধ জাগ্রত হয়। তাছাড়া তারাও যেন অমুসলিমদের মধ্যে দীনি দাওয়াতের কথা ভাবতে শিখে। মূলত এ উদ্দেশ্যেই আব্বু ফোন করেছেন। বলেছেন- তোমার ইন্টারভিউর কারণে এখনও আরমুগান প্রেসে পাঠানো হয়নি। আমি আব্দুর রহমানকে বলেছি। তুমি দ্রুত এসে তার সাক্ষাৎকারটা নাও। তারপর সেটা মাওলানা ওয়াসির কাছে পাঠিয়ে দাও।
আবদুর রহমান: হ্যাঁ, ভাই আহমদ! আমি বিষয়টি জেনেছি। তাছাড়া আমিও নিয়মিত নওমুসলিমদের সাক্ষাতকারগুলো পড়ি। হযরত আমাকে এ কথা বলেই পাঠিয়েছেন। আমি আপনার অপেক্ষায়ই ছিলাম। এখান থেকে আমাকে আবার আজমির যেতে হবে।

আহমদ আওয়াহ: হ্যাঁ, আমিও সে কথা জেনেছি। আচ্ছা, প্রথমেই আমি আপনার পরিচয় জানতে চাইবো।
আবদুর রহমান: বিদ্যালয়ে আমার নাম ছিল অমিত কুমার। পরিবারের লোকেরা ডাকতো জগুন বলে। খাতুলির পাশেই ভাইসি নামক গ্রামে আমার জন্ম। বাবার নাম ডাক্তার মোহন কুমার। আমরা চার ভাইবোন। তিন ভাই আর এক বোন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পড়া লেখা সম্পর্কে কিছু বলুন।
আবদুর রহমান: আমি হাই স্কুল পাশ করেছি।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে কিছু বলুন!
আবদুর রহমান: ছোটকালে আমি খুব দুষ্টমি করতাম। কখনই নির্দিষ্ট সময়ে হোম ওয়ার্ক করতাম না। ফলে স্কুলের দেয়া কাজগুলো করার জন্য আমার বন্ধুদের খাতার প্রয়োজন পড়তো। একবারের ঘটনা। আমি হোম ওয়ার্ক করিনি। ফলে এক বন্ধুর কাছে যেতে হলো। সম্ভবত তার নাম ছিল মুস্তাকিম। বাড়িতে গিয়ে ওকে পেলাম না। পরিবারের লোকেরা বললো মসজিদে গেছে। আমি সেখান থেকে সোজা মসজিদে চলে গেলাম। কিন্তু আমার সহপাঠি বন্ধুটি আমাকে মসজিদে দেখামাত্রই অবাক দৃষ্টিতে বললো- তুমি মসজিদে চলে এলে কিভাবে? তুমি তো নাপাক, বেরিয়ে যাও।
আমি বললাম- আমার পোশাক তোমার চে’ পরিষ্কার ও দামী। আমি নাপাক হলাম কী করে? কিন্তু তার পরিষ্কার কথা; তুমি নাপাক, বেরিয়ে যাও। তার প্রতি তখন আমার প্রচুর রাগ হলো। সে তখন কুরআন শরীফ পড়ছিল। আমি বললাম- স্কুলের ছোটছোট বই পড়তে পার না, আর এখানে এসে এতো মোটা বই নিয়ে বসেছো। সে বললো- এটা আল্লাহর কালাম, তারপর সে আমাকে বিষয়টি বুঝাতে লাগলো। তার প্রতি আমার রাগ তখন ছিল চরমে। এদিকে তার খাতাটিও আমার দরকার। তাই কোনো কিছু না বলে খাতাটি নিয়ে ঘরে চলে এলাম। পরের দিন কয়েকজন বন্ধু মিলে তার কলার চেপে ধরলাম। বললাম, একজন চৌধুরীর সন্তানকে মসজিদ থেকে বের করে দেয়ার মতো কথা বলতে তোমার মুখে বাঁধলো না। কত বড় সাহস তোমার, মসজিদ কি তোমার বাবার? আমার সাথে মন্দিরে চল। তোমাকে যদি কেউ কিছু বলে বা বের করে দিতে চায় তার কী দশা হয় দেখো। তখন সে আমাকে বললো- এটা আল্লাহর ঘর। সেখানে কোনো নাপাক ব্যক্তি ঢুকতে পারে না। সে আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলো- আচ্ছা, তোমরা মন্দিরে গিয়ে কী পড়ো? আমি তাকে কয়েকটি শ্লোক পাঠ করে শোনালাম। তারপর আমিও তাকে প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা তুমি বলো- মসজিদে গিয়ে তুমি কী পড়ছিলে? সে বললো- আমি আল্লাহর কালাম পড়ছিলাম। অবশ্য ওটা তুমি বুঝবে না। কেউ যদি অন্তর লাগিয়ে এ কালাম পাঠ করে তার অনেক উপকার হয়। তারপর সে আমাকে কালেমা পড়িয়ে দিল, ভাই আহমদ! তখন আমার মনে হলো আমার ভেতর যেন একটি আলো প্রবেশ করানো হলো।

আহমদ আওয়াহ: এরপর কী হলো?
আবদুর রহমান: তারপর আমি খাতুলিতে পিকেট ইন্টার কলেজে ভর্তি হলাম। সেখানে প্রতি শুক্রবারে জুমার সময় ক্লাসে ঘোষণা করা হতো- যারা জুমার নামায পড়তে চাও হাত উঠাও। যারা হাত উঠাতো তাদের ছুটি দেয়া হতো। সুযোগ বুঝে মাথা নিচু করে আমিও হাত উঠাতাম, তারপর বাইরে এসে ঘুরে বেড়াতাম। এক শুক্রবারের কথা, জুমার নামাযের ছুটি নিয়ে বাইরে এসেছি তখন মুসলমান বন্ধুরা আমাকে ঘিরে ধরলো। বললো- তুমি নামাযের ছুটি নিয়ে বাইরে আসো অথচ নামায পড়ো না।
একথা বলে ধরে মসজিদে নিয়ে গেলো। যাওয়ার পথে আমাকে নামাযের নিয়ত ইত্যাদি শিখিয়ে দিল।

আহমদ আওয়াহ: তারপর?
আবদুর রহমান: তারপর আমি মুজাফফরনগর জৈন ইন্টার কলেজে চলে গেলাম। সেখানে খালাপাড় নামে একটা জায়গা আছে। সেখানে আমি প্রায়ই লাচ্ছি পান করতে যেতাম। সেখানে এক লোক আমাকে বললো- বন্ধু! তুমি দেখতে এতো সুন্দর অথচ একদিন তোমাকে আগুনে পুড়তে হবে। আমি বললাম- আমাকে আগুনে পুড়তে হবে কেন? সে বললো- শুধু আগুন নয়; মাথার একেবারে কাছে সূর্য চলে আসবে, মানুষের মাথার মগজ রান্না হতে থাকবে। সেদিন ঐ কঠিন অগ্নিতাপ থেকে কেবল ঈমানদাররাই মুক্তি পাবে। লোকটি আমাকে প্রায়ই এসব বোঝাতো। তার আচরণও ছিল চমৎকার। কিন্তু আমি তার কথা তেমন মনোযোগ দিয়ে শুনতাম না। তারপর আমি যখন খাতুলিতে বুড়হানা রোডে নজেলপ্লাঞ্জার-এর কাজ করতে লাগলাম; তখন পরিচয় হলো এনাম ভাইয়ের সাথে। এনাম ভাই আমাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। কিছু দিন পর তিনি আমাকে মাওলানা শাকিল সাহেবের কাছে নিয়ে যান। তিনি ভাউড়িতে থাকেন। মাওলানা শাকিল সাহেব আমাকে কালেমা পড়ান। তারপর এনাম ভাই খুব যত্মের সাথে আমাকে নিয়মিত নামায পড়াতে থাকেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে বেশ কয়েক বছর ধরে ফুলাত দেখতে পাচ্ছি। এখানে এলেন কী করে?
আবদুর রহমান: হ্যাঁ, ভাই আহমদ! খাতুলিতে রিয়াজুদ্দিন সাহেব নামে এক ভদ্রলোক আছেন। তিনি একবার আমাকে বললেন- আব্দুর রহমান! কাজ-কাম তো চলতেই থাকবে। তাছাড়া কাজ-কাম তো সকলেই জানে এবং শেখে। আমি মনে করি সব কিছুর আগে আপনাকে ইসলাম শেখা উচিত। ইসলাম শিখতে হবে বুঝতে হবে এবং মানতে হবে। আমি বললাম খুব ভালো কথা। তারপর তিনি আমাকে ইসলাম শেখার জন্য ফুলাত পাঠিয়ে দেন।

আহমদ আওয়াহ: আচ্ছা! আপনি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন?
আবদুর রহমান: ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারী সোমবার আমি ইসলাম গ্রহণ করি। তারপর চৌদ্দ বছর পর্যন্ত আমি নানা বিষয়ে শিখেছি, নানা জায়গায় গিয়েছি। তারপর যখন হযরতের কাছে এলাম, তখন আলহামদুলিল্লাহ অনেক কিছু শিখেছি।

আহমদ আওয়াহ: আব্বুর সাথে আপনার প্রথম সাক্ষাত কিভাবে হয় এবং কোথায় হয়?
আবদুর রহমান: তিন বছর আগের কথা। আমি তখন ফুলাতে এক ব্যক্তির কাছে থাকতাম। তার সাথে আমার বনিবনা হচ্ছিলো না। আমি তাকে ছেড়ে তখন বাড়ি চলে এলাম। বাড়িতে যাওয়ার সময় আমার মনোভাব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু এদিকে লোকজন খবর ছড়িয়ে দিল- আব্দুর রহমান মুরতাদ হয়ে গেছে। অথচ বিষয়টা এমন ছিল না। তারপর আমার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আপনার আব্বুর কাছে চলে আসি। তখন আমার মাথায় বেশ পাগলামী ছিল। অস্ত্রের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক ছিল। আমি ফুলাতে এসেছিলাম মূলত এই কারণেই যে, যে লোকটির সাথে আমার ঝগড়া হয়েছে তাকে খুন করে ফেলবো। অস্ত্র আমার কাছে ছিল। কিন্তু আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে মাওলানা সাহেব বিষয়টি জানতে পারলেন। তিনি তখন আমাকে বুঝালেন- হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের জীবনে বরাবর কুরবানী দিয়েছেন, মানুষকে ছাড় দিয়েছেন। তাঁর কথায় আমি ধৈর্য ধরলাম। আসলে হযরতের কাছে আসার পর আমি আমার জীবনে একটা ভিন্ন ধরনের শান্তি ও স্বস্তি খুঁজে পেয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: এ পর্যন্ত ইসলাম সম্পর্কে আপনি যা কিছু জেনেছেন, তা কীভাবে জেনেছেন বলবেন কি?
আবদুর রহমান: এমন প্রশ্ন আমাকে অনেকেই করেছে, কারও কারও প্রশ্ন ছিল- কোন্ বিষয়টি আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছে। আমি বলতে চাই- ইসলামের মধ্যে কোন বিষয়টি এমন আছে যা মানুষকে প্রভাবিত করে না? যেমন- সুন্নাতী পোশাক। চেহারায় দাড়ি। পাঁচ ওয়াক্ত নামায। তাছাড়া ঈমানদারদের পারস্পরিক লেনদেন, আচার-আচরণ, পরস্পরে একসঙ্গে বসে খানা-পিনা করা- ভ্রাতৃত্বের এমন উদাহরণ আর কোথায় আছে? এ সবকিছুই আমাকে প্রভাবিত করেছে। একই ঘরে লালিত-পালিত মা-বাবা এবং ছেলে মেয়েরা যেখানে একে অপরের মুখ দেয়া কোনো খাবার গ্রহণ করতে পারে না। সেখানে মুসলমানগণ আরেকজন অচেনা মুসলমানের সঙ্গে বসে কত নিবিড়ভাবে খানা খাচ্ছে। আমি আমার বাবার কথাই বলবো। তিনি কখনও আমার পানি খাওয়া গ্লাসে পানি খেতেন না। এমনকি আমিও তার গ্লাসে কখনও মুখ লাগাতাম না। এসব বিষয়ই আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। সেগুলো দেখেই আমি মুসলমান হয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: আমি জানতে চেয়েছিলাম এ পর্যন্ত আপনি ইসলাম সম্পর্কে যতটকু জেনেছেন কার থেকে এবং কিভাবে?
আবদুর রহমান: এর মাধ্যম হল, হযরত (মাও. কালিম সিদ্দিকী) আমাকে জামাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমি জামাতে গিয়ে নামায ইত্যাদি শিখেছি। ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি আলহামদুলিল্লাহ। এ পর্যন্ত আমি তিন চিল্লা দিয়েছি। এখন আমার ভেতর যতটুকু মানবতা আছে, সবটুকু আপনার আব্বুর বরকত। তাঁর সাথে থেকে তাঁর কথাবার্তা শুনে ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি ভালোই ধারণা লাভ করেছি এবং সে অনুযায়ী চলারও চেষ্টা করছি।

আহমদ আওয়াহ: আজকাল কী করছেন?
আবদুর রহমান: আমি হেকিমী শিখেছি। এখন চিকিৎসালয় খোলার কথা ভাবছি।

আহমদ আওয়াহ: হেকিমীর দিকে মন ঝুঁকলো কেন আপনার?
আবদুর রহমান: ভাই আহামদ! আপনার আব্বু আমাকে বললেন, আব্দুর রহমান! কিছু একটা কর। অবসর থাকা ভালো নয়। আমি বললাম, ড্রাইভিং শিখতে চাই। তিনি বললেন- এটা কোনো কাজ হলো? আমি বললাম- মাদ্রাসার পাশে একটা ক্যান্টিন খুলি? তিনি বললেন- কোথাও যদি তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাই তখন তারা জিজ্ঞেস করবে- ছেলে কী করে? আমাকে তখন বলতে হবে, দোকান করে, থালাবাটি ধোয়। এমন কিছু করো যাতে আমাদের ভালো লাগে ও তুমি সুখে থাকো। তারপর আমি হযরতের অনুমতিক্রমে হেকিমী শিখতে চাইলাম। হযরত আমাকে সেদিনই দেওবন্দে হেকিম আসিফ সাহেবের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে থেকে কিছুদিন হেকিমী শিখি, তারপর ডাক্তার নজরুল ইসলাম সাহেবের কাছে কিছু দিন থেকেছি। তারপর হযরত আমাকে হেকিম জামিল সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দেন। এক বছরের মত ওখানে থাকার পর ফিরে এসেছি। এখন ভাবছি ডাক্তারখানা খুলবো এবং মানুষের সেবা দেয়ার চেষ্টা করবো।

আহমদ আওয়াহ: আপনার বাবা-মার সাথে যোগাযোগ আছে কী?
আবদুর রহমান: হ্যাঁ, আহমদ ভাই! আমি তাঁদের কাছে গিয়েছিলাম। তারা আমাকে বুঝিয়েছেন পুরনো ধর্মে ফিরে আসার জন্য। তারা এ-ও বলেছেন- মোল্লাদের ফাঁদে পড়েছো, ওখানে থেকে তোমার কী হবে? আমি বলে দিয়েছি- মোল্লাদের ফাঁদে আমি পড়িনি। আমি এখন একটি সত্যধর্ম মেনে চলছি। আপনাদেরকেও ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি।
একদিনের ঘটনা। আমি দুধদোহন করছিলাম। আমাদের ঘরে সৎ মা। তার দুর্ব্যবহারের কারণে আমি একবার ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। মূলত তার ব্যবহারে অতিষ্ট হয়েই আমি ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। এই মা না থাকলে হয়তো মুসলমান হওয়া যেত না। এই হিসেবে আমার প্রতি তার অনুগ্রহ অনেক। তিনি একবার আমাকে বুঝাতে লাগলেন এখনও সময় আছে। নিজেদের ধর্মে ফিরে এসো। আমি তাকে বললাম- এই যে দুধদোহন করছি, এইদুধ যেমন পুনরায় মহিষের স্তনে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়, ঠিক তেমনিভাবে আমার পক্ষেও ইসলাম ছেড়ে হিন্দুধর্মে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার কথাবার্তায় পরিবারের লোকেরা বুঝতে পারে আমি তাদের কথা কোনভাবেই মেনে নেব না। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় একে চিরতরে শেষ করে দেওয়াই ভালো। বাঁশও থাকবে না, বাঁশিও বাজবে না। তাদের এ পরিকল্পনার কথা আমার ছোট বোন আমাকে জানিয়ে দেয়। সে আমাকে বলে- পরিবারের লোকজন তোমাকে মেরে ফেলতে চায়, তুমি এখান থেকে পালাও। আমি রাতের মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম। জানতে পেয়ে পরিবারের লোকেরা আমার পিছু নিল। আমার আয়াতুল কুরছি মুখস্ত ছিল। আয়াতুল কুরসী পড়ে আমার শরীরে ফুঁ দিলাম। তারপর এক জায়গায় আস্তে করে লুকিয়ে পড়লাম। ভাই আহমদ! আমার চোখের সামনে ওরা কয়েকবার ঘোরাঘুরি করেছে কিন্তু আমাকে দেখেনি। তারপর তারা ঘরে ফিরে যায়। সকালে আমি তাদের ফোন করি। তারা বলে এবারের মতো বেঁচে গেছো পরবর্তীতে আর পালাতে পারবে না।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কি তাদের সাথে আপনার আর সাক্ষাত হয়েছে?
আবদুর রহমান: না, আহমদ ভাই! সাক্ষাত হয়নি। কারণ তারা গাজিয়াবাদ চলে যায়। আমি খাতুলিতে একবার দূর থেকে আমার আব্বুকে দেখেছিলাম।

আহমদ আওয়াহ: আপনার আব্বুকে ইসলাম দাওয়াত দেননি?
আবদুর রহমান: দাওয়াত দিয়েছি। একবার তো তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে প্রায় প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন। ইসলাম বুঝার জন্য ফুলাতে এসেছিলেন। তিনি এ বিষয়ে আমার মায়ের সাথে আলোচনা করছিলেন। হয়তো তার ভাগ্যে হেদায়েত ছিল না। আমাদের এই কথাবার্তার মাঝেই তার কাছে এক নেতা এসে উপস্থিত হয়। আব্বু তখন আমার মাকে রেখে নেতার সাথে বেরিয়ে যান। আমার মা দুই ঘন্টা তার জন্যে অপেক্ষা করেন। কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি। আমি আমার মায়ের খুব যত্ম করি। অবশেষে তিনিও মন খারাপ করে চলে যান। তারপর তিনি আমার সাথে ফোনে কথা বলাও ছেড়ে দেন। বর্তমানে আমার আব্বুর পেছনে যথেষ্ট মেহনত করছি। আমার আব্বু গংগুহে ক্লিনিক খুলেছেন। আমি এইমাত্র জামাত থেকে এসেছি। আমাদের জামাতের আমীর ছিলেন গংগুহের এক ভদ্রলোক। তাঁর সাথে কথা হয়েছে তিনিও আমার পিতার পিছনে দাওয়াতী কাজ করবেন। আমি আপনার কাছে এবং পাঠকদের কাছে দুআ চাইবো, আল্লাহ তায়ালা যেন খুব তাড়াতাড়ি আমার আব্বুকে হেদায়েত করেন। (আমিন)

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণের পর আপনাকে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে?
আবদুর রহমান:  আমাকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এর মধ্যে একটা বড় সমস্যা ছিল- আমাদের বাড়িতে অনেকগুলো মহিষ আছে। আমি কখনও মহিষের গোবর তুলিনি। কিন্তু পরিবার ছাড়ার পর আমাকে এ কাজও করতে হয়েছে। কখনও কখনও আমাকে মানুষের বাড়ীতে কাজ পর্যন্ত করতে হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার জীবনের কোনো একটি সুন্দর ঘটনা আমাদের শুনান।
আবদুর রহমান: নিযামুদ্দিন থেকে আমাদের জামাত কুলহাপুর যাচ্ছিল। সফরে বের হওয়ার আগেই আমাদের সফরের বিভিন্ন আদব বলে দেয়া হয়েছিল। এ-ও বলা হয়েছিল- সফরে যে দুআ করা হয় তা খুব দ্রুত কবুল হয়। আমরা ট্রেনে বসা ছিলাম। দুআর বিষয়টি হঠাৎ আমার মনে হলো। আমার পায়ে তখন ছিল মারাত্মক জখম। আমি হাত তুলে আল্লাহ তায়ালার কাছে মুনাজাত করলাম- হে আল্লাহ! তোমার নেক বান্দাগণ বলেছেন- সফরের দুআ দ্রুত কবুল হয়। আমি অত্যন্ত গুনাহগার বান্দা। তুমি দয়া করে আমার দুআ কবুল কর। আমার পায়ের জখমগুলো ভালো করে দাও। আহমদ ভাই! আমি আপনাকে কিভাবে বিশ্বাস করাবো, কুলহাপুর স্টেশনে পৌঁছার আগেই আমার পায়ের ঘা পরিপূর্ণরূপে ভালো হয়ে যায়। সেটা শুধু এক কুলহাপুরের ঘটনা নয়; এখনও আল্লাহ তায়ালার কাছে যা চাই, তাই পাই।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
আবদুর রহমান: মুসলমান ভাইদের প্রতি আমার পয়গাম হলো- আপনারা আপনাদের ধর্মের উপর অবিচল থাকুন।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آَمَنُوا آَمِنُوا ـ
হে ঈমানদাগণ! তোমরা ঈমান আন।

আমি এখন থেকে সতের বছর আগে মুসলমানদের মধ্যে যে ঈমান দেখতে পেয়েছি তা এখন আর দেখি না। যারা আমাকে একসময় ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, এখন দেখি তারা নামায পর্যন্ত পড়েনা। তাদের আমি মাঝেমাঝেই বলি, তোমরাই আমাকে এখানে পৌঁছে দিলে অথচ নিজেরা পড়ে রইলে কোথায়? ঈমানের ভিতর পুরোপুরি প্রবেশ করার উদ্দেশ্য হলো- আমরা আল্লাহর রসূল ও আল্লাহর হুকুমের অনুসারী হবো, এবং অন্যকে দ্বীনের উপর দাওয়াত দিব। এরচেয়ে বড় কোনো কাজ আল্লাহ আমাদের দেন নি। এর বাইরে আমরা যা কিছু করছি প্রয়োজন পূরণের জন্য করছি। হযরত মাও. কালিম সিদ্দিকী সাহেব যেই কাজ করছেন সেটা হলো এটা। তার চিন্তা-ভাবনাও এটাই। দিন-রাত তিনি যে কাজ করেন সবগুলো দ্বীনের জন্য। আমরা যদি এমন ঈমানওয়ালা হয়ে যাই, তাহলে ইনশাআল্লা আমি মনে করি, কুফরের নাম এই দুনিয়া থেকে শেষ হয়ে যাবে। আর চার দিকে শুধু ইসলাম আর ইসলামই দেখা যাবে।


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, এপ্রিল ২০০৮