হিন্দু মুসলিম সংলাপ

হিন্দু মুসলিম সংলাপ

একজন হিন্দু ভাইয়ের সাথে একজন মুসলিমের সংলাপ । এই সংলাপ থেকে উপকৃত হতে পারবেন ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষ সকলেই। পাঠক আপনাদের সময় নষ্ট করবোনা, এখনই শুরু করছি। চলুন পড়ি বুঝি এবং মিলিয়ে নেই জীবনের সাথে।
আব্দুল্লাহ: ‘আসসালামু আলা মানিত্তাবাআল হুদা’। (শান্তি বর্ষিত হোক যিনি হেদায়াতের অনুসারী) দাদা! ভালো আছেন তো?
রমেশচন্দ্র রায় : আদাব। জি, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না যে? আপনার বাড়ি যেন কোথায়?
আব্দুল্লাহ : আমি আপনারই একজন ভাই। আমার নাম আব্দুল্লাহ। আপনার পাশের গ্রামে আমার বাড়ি।
রমেশ : কী ব্যাপার! কী উদ্দেশে আসা হলো?
আব্দুল্লাহ : আপনার সাথে দেখা করতে এলাম। কিছু কথা বলতে চাই।
রমেশ : বলুন! অবশ্যই বলুন।
আব্দুল্লাহ : দেখুন, আমাদের সমাজে একটি বড় ধরনের ভুল বোঝাবুঝি আছে। আর তা হলো অনেক সময় দেখা যায়, আমরা মুসলমানগণ কোনো হিন্দুভাইকে দেখে নাক সিটকাই, লোকটি হিন্দু হওয়ার দরুন তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। অনেক হিন্দুভাই মুসলমানকে দেখে নাক সিটকায়। তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। আসলে এমনটি হওয়া উচিত নয়। কারণ হিন্দু-মুসলিম এই পার্থক্যটি আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। আমার-আপনার মালিক ও মহান স্রষ্টা এই ভাগ করেননি। তিনি তার পবিত্র গ্রন্থে স্পষ্ট ভাষায় হিন্দু-মুসলিম সকলকে উদ্দেশ্য করে বলছেন। ‘‘হে মানুষ সকল! তোমরা পূজা কর তোমাদের প্রভুর।”

এখানে আল্লাহ তাআলা হিন্দু বা মুসলিম কিছুই পৃথক করেননি। বরং সকল মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন, শুধুমাত্র তারই পূজা করতে বলেছেন। ঠিক কি-না?
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই আপনি ঠিকই বলেছেন।
আব্দুল্লাহ : রমেশ ভাই! আমি আপনাকে সেই আল্লাহ সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। আপনি একটু মুহাব্বতের সাথে শুনবেন?
রমেশ : হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন। মালিক সম্পর্কে সকলের জানা উচিত।
আব্দুল্লাহ : এই মহা পবিত্র গ্রন্থে ‘বিশ্ব মালিক’ বিবেকের মাপকাঠিতে যাচাইয়ের জন্য অনেক দলিল প্রমাণ আমাদের সামনে পেশ করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-“আসমান ও যমীনে যদি অনেক মালিক (প্রভূ) থাকতেন, তাহলে আসমান ও জমিন ফাসাদে ভরে যেতো”। এক আল্লাহ ছাড়া একাধিক নিয়ন্ত্রণকারী হলে স্বাভাবিক ভাবেই বিবাদ সৃষ্টি হতো। যদি একজন বলতেন এখন দিন হোক, তো অপরজন বলতেন রাত হোক। একজন বলতেন, ছয়মাসে একদিন হবে, আরেকজন চাইতেন, তিন মাসে একদিন হবে। একজন বলতেন, আজ সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে। অন্য জন দাবি করতেন, পূর্ব দিক থেকে উঠবে। আর দেব-দেবীদের এই কিচ্ছা-কাহিনী যদি বাস্তব হতো, তাহলে কখনো এমন হতো যে, একবান্দা পূজা-অর্চনা করে বৃষ্টি দেবতার কাছে দাবি করতো তখন স্বাভাবিক ভাবেই নিচের স্তরের ‘মালিকগণ’ হরতাল ডেকে বসতেন। লোকজনকে অপেক্ষা করতে হতো যে, আজকে দিন আসবে না। মনে হয় সূর্যদেবতা হরতাল ডেকেছেন।
দুনিয়ার সকল বস্তু এবং সুশৃঙ্খলরূপে পরিচালিত বিশ্ব জগতের সুনিপুণ ব্যবস্থাপনা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, বিশ্বজাহানের মালিক-অধিপতি একজন। তিনি সকল ক্ষমতার উৎস। তিনি যা চান, তাই করতে পারেন। মানুষের কল্পনার বহু ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান। জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে তাঁর ছবি আঁকা যায় না। সমগ্র পৃথিবীকে তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। চন্দ্র-সূর্য, আকাশ-মাটি, আগুন-পানি, জড়-জীব সবকিছুই মানুষের উপকারের জন্য তিনি সৃজন করেছেন। মানুষকে সবকিছুর সরদার বানিয়েছেন। আর মানুষকে শুধুমাত্র এজন্য সৃষ্টি করেছেন, যেন তারা তাঁর গোলামি ও পূজা করে এবং তাঁর হুকুম মানে।
সৃষ্টিকর্তা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, আহারদাতা ও সমস্ত প্রয়োজন পূরণকারী যেহেতু আল্লাহ তাআলা, তাই জীবন ও জীবন সম্পর্কিত সকল চাওয়া-পাওয়া তাঁর সন্তুষ্টি ও নির্দেশ মতে ব্যবহার হওয়াই ইনসাফের দাবি। বরং মহান মালিকের আনুগত্যে জীবন অতিবহিত না করলে মানুষ বলে দাবি করারই অধিকার থাকে না। অতএব আমাদের এক মালিক আল্লাহকেই মানতে হবে। তার সাথে কাউকে অংশীদার বানানো যাবে না।
এ বিষয়ে আমি আপনাকে আরো কিছু আল্লাহর বাণী শোনাতে চাই। দেখুন আল্লাহ তাআলা কি বলেন-
“আমাদের উপাস্য ও তোমাদের উপাস্য একই এবং আমরা তারই আজ্ঞাবহ আত্মসমর্পণকারী।”
এক উপাস্যের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন,
“তিনিই আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই; তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন। তিনি পরম দয়ালু, অসীম দাতা।”
আল্লাহ তার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন-
‘আল্লাহ্ যিনি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্র্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোনো অভিভাবক ও সুপারিশকারী নেই। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না? ’ অতএব এই এক আল্লাহকেই মানতে হবে।
রমেশ : আমরাও তো এক মালিককে মানি। মালিক একজন তবে তার শক্তিগুলো বিভিন্নজনের কাছে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। যেমন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন আর তার কাজগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। সেই মালিককে পাওয়ার জন্যই মূর্তিগুলোর পূজার মাধ্যমে তাকে পেতে চাই, মূলত সেই মালিককেই পূজা করি।
আব্দুল্লাহ : রমেশ ভাই! সেই মালিককে পাওয়ার জন্য কোনো মূর্তির মাধ্যম প্রয়োজন হয় না, বরং এই মূর্তি পূজা হলো মহাপাপ।
প্রকৃত প্রভু-মালিকের পবিত্র কালাম কুরআনে কারীমের ভাষ্য মতে নেক কাজ দুই প্রকারে বিভক্ত, ছোট আর বড়। তেমনিভাবে তাঁর নিকট গুনাহ ও পাপাচারও দুই প্রকারে বিভক্ত। তিনি আমাদেরকে বলেছেন, যে পাপের কারণে সবচে কঠিন শাস্তি হবে, যে গুনাহ কখনো আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, যে পাপের কারণে অনন্তকাল নরকের আগুনে জ্বলতে হবে, সেই গুনাহ হলো অদ্বিতীয় মালিকের সাথে কাউকে শরিক করা। এক আল্লাহ, মহান মালিক ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা নত করা, হাত জোড় করা, তাঁকে রেখে অন্য কাউকে পূজার যোগ্য মনে করা, জন্ম-মৃত্যুদানকারী রিযিকদাতা ও ত্রাণকর্তা মনে করা গর্হিত এবং বুদ্ধিহীনতার কাজ। দেব-দেবী, চন্দ্র্র্র-সূর্য, পীর-ফকির এবং যে কোনো বস্তুকে পূজার উপযুক্ত মনে করা শিরক। আল্লাহ তাআলা যা কখনোই ক্ষমা করেন না। শিরক ছাড়া অন্য যে কোনো গুনাহ আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
ভক্তি-ভালোবাসার ক্ষেত্রে অংশীদারিত্বকে আমরাও কোনো দিন মেনে নিতে পারি না। যেমন-
কারো স্ত্রী ঝগড়াটে, মন্দচারিণী, গাল-মন্দকারিণী, অবাধ্য এবং বেপরোয়া স্বভাবের হলে স্বামী তাকে বেরিয়ে যেতে বলার পর সে বলতে থাকে, আমি শুধু তোমার, তোমারই থাকবো, তোমার ঘরে মরবো, এক পলকের জন্যও তোমার ঘর ছেড়ে কোথাও যাবো না। তাহলে স্বামী শত রাগের পরও তাকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হবে। অপরদিকে কারো স্ত্রী অত্যন্তস্বামী সোহাগা এবং অনুগত, সর্বদা সে স্বামীর চিন্তায় অস্থির। স্বামী গভীর রাতে ঘরে ফিরলে তার অপেক্ষায় বসে থাকে। খাবার গরম করে দেয়, প্রেম-ভালোবাসায় স্বামীকে ডুবিয়ে রাখে। একদিন প্রিয় স্ত্রী আদরের স্বামীকে বলে, তুমিতো আমার জীবন সঙ্গী। তোমার উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু তোমার একার দ্বারা আমার চাহিদা মেটে না। তাই আমি পাশের বাড়ির যুবকটিকে আমার দ্বিতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ করলাম। সামান্যতম আত্মমর্যাদাবোধও যদি সেই স্বামীর থাকে, তাহলে কখনই সে তা সহ্য করতে পারবে না। এটা কেন হচ্ছে? তার একমাত্র কারণ হলো, স্বামী কখনোই স্ত্রীর উপর প্রতিষ্ঠিত অধিকারে অন্য কাউকে অংশীদার হিসেবে দেখতে পছন্দ করে না। একটি শুক্রকণা থেকে মানুষ যখন অংশীদারিত্বকে মেনে নিতে পারে না, তাহলে যে মহান প্রভু নাপাক ক্ষুদ্র কীট হতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি কী করে তাঁর একক সৃষ্টিতে অংশীদারিত্ব মেনে নিবেন? তাঁর সাথে অন্য কারো পূজা-অর্চনা মেনে নিবেন? দুনিয়ায় সবকিছুই তিনি দিয়েছেন। যেভাবে একজন চরিত্রহীন নারী সব পুরুষকে আশ্রয় দেয়ার ফলে নীচ বলে পরিচিত লাভ করে, তেমনি আল্লাহর দরবারে ওই ব্যক্তি আরো বেশী নিকৃষ্ট, যে তাঁকে ছেড়ে দেবতা, মূর্তি বা অন্য কোনো বস্তুর পূজায় মগ্ন হয়।
এবার শুনুন মূর্তিপূজার স্বরূপ সন্ধানে আল-কুরআন কী বলে; এ ব্যাপারে কি আপনাকে কিছু বলতে পারি?
রমেশ : জী হ্যা,ঁ অবশ্যই। কুর’আনেও কি মূর্তিপূজা সম্বন্ধে লেখা আছে?
আব্দুল্লাহ : তাহলে শুনুন কুরআন এ ব্যাপারে কী বলে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “হে লোক সকল! একটি উপমা বর্ণনা করা হলো, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোন; তোমরা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদের পূজা কর, তারা কখনও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সকলে একত্রিত হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না। প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়েই শক্তিহীন।”
বাতিল উপাস্যদের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন-
আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা সবাই তোমাদের মতোই বান্দা। অতএব, তোমরা যখন তাদেরকে ডাক, তখন তাদের পক্ষেও তো তোমাদের সে ডাক কবুল করা উচিতÑ যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক
তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের ইবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছে। আল্লাহ্ এদের কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। আল্লাহ্ ছাড়া কারো বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না-এটা সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।
‘তোমরা তো আল্লাহ্র পরিবর্তে কেবল প্রতিমারই পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। তোমরা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদের ইবাদত করছ, তারা তোমাদের রিযিকের মালিক নয়। কাজেই আল্লাহ্র কাছে রিযিক তালাশ কর, তার ইবাদত কর এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’
বাতিল উপাস্যদের দুর্বলতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
‘তারা তার পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং নিজেদের ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না এবং জীবন, মরণ ও পুনরুজ্জীবনেরও তারা মালিক নয়।’
আল্লাহর সাথে র্শিক করা যাবে না; দেখুন আল্লাহ তাআলা কি বলেন-
স্থির করো না আল্লাহ্র সাথে অন্য কোনো উপাস্য। তাহলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে।’
আল্লাহর সাথে র্শিক করা নিজের জন্য বিশাল ক্ষতি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘তাদের জন্যে ওপর থেকে এবং নীচের থেকে আগুনের মেঘমালা থাকবে। এ শাস্তি দ্বারা আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদেরকে সতর্ক করেন যে, হে আমার বান্দাগণ! আমাকে ভয় কর।’
‘আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহ্র শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন।’
আল্লাহ সবচেয়ে বড় কুদরত ওয়ালা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘তিনি হলেন ওই সত্তা যাঁর রয়েছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব। তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি। রাজত্বে তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তিনি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে পরিমিতভাবে শোধিত করেছেন।’

রমেশ : আচ্ছা আব্দুল্লাহ ভাই! দেব-দেবীরা মূলত আমাদেরকে মালিক পর্যন্ত পৌঁছার পথ দেখিয়ে দেয় এবং তাদের মাধ্যমে আমরা মালিক-বিশ্বপ্রভুর দয়া অনুগ্রহ পেয়ে থাকি, তাই আমরা তাদের পূজা-অর্চনা করি। এতে অসুবিধাটা কী?
আব্দুল্লাহ : রমেশ ভাই! এ ধরনের খেয়াল সঠিক নয়। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজেই বুঝতে পারবেন, ব্যাপারটি হলো এমন “কুলির কাছ থেকে ট্রেনের বিবরণ জেনে ট্রেনের বদলে কুলির উপর চেপে বসার মতো। ট্রেনের দিকনির্দেশকারী কুলির উপর সওয়ার হওয়া যেমন নিছক বোকামি ছাড়া কিছুই নয়, তেমনি আল্লাহকে পাওয়ার পথনির্দেশকারীর পূজা করাও নিতান্ত বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। কেউ ধ্যানমগ্ন এবং গভীর মনোনিবেশ আনয়নের জন্যই মূর্তিকে সামনে রাখি। এ উদাহরণটি এমনই যে, কেউ গভীরভাবে একটি পিলারের দিকে তাকিয়ে আছে আর বলছে, পিতার ধ্যানে নিবিষ্ট হওয়ার জন্য গভীরভাবে পিলারের দিকে তাকিয়ে আছি! এমন কথা কি মেনে নেওয়া যায়? কোথায় পিতা আর কোথায় পিলার! কোথায় দুর্বল মূর্তি আর কোথায় বিশ্বপ্রতিপালক! এতে মালিকের প্রতি ধ্যান তো বাড়বেই না বরং আরো নষ্ট হবে। মোট কথা, যে কোনো উপায়ে তাঁর সাথে শরিক করা মারাত্মক গুনাহ, অন্যায়। অংশীদারিত্বের পাপ (শিরক) তিনি কখনও ক্ষমা করবেন না। শিরককারী চিরদিনের জন্য জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হবে।
রমেশ ভাই, আপনি কি জানেন মূর্তিপূজা কিভাবে শুরু হয়েছে, তার ইতিহাস কী?
রমেশ : না, এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা নেই, তবে বাপ-দাদারা করে আসছেন তাই জানি।
আব্দুল্লাহ : আমি আপনাকে এ বিষয়ে কিছু বলব কি?
রমেশ : হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন।
আব্দুল্লাহ : দেখুন রমেশ ভাই! আল্লাহর বাণী প্রচারকারী এসব নবী-রসূল মানুষ ছিলেন। অপরাপর মানুষের মতো তারাও মৃত্যুবরণ করতেন। (যার মৃত্যু নেই তিনি হলেন একমাত্র আল্লাহ) পয়গাম্বরগণের মৃত্যুর পর অনুসারীদের যখন তাঁদের কথা মনে হতো, তখন তারা খুব কান্নাকাটি করতেন। শয়তান সে সুযোগটাকে কাজে লাগালো। শয়তান মানুষের আজন্ম শত্রু। (মানুষকে পরীক্ষার জন্য প্রভু শয়তানকে ধোঁকা-প্রতারণা এবং মন্দকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য ক্ষমতা প্রদান করেছেন। কে সৃষ্টিকর্তাকে মানে আর কে শয়তানের আনুগত্য করে এটা যেনো সুস্পষ্ট হয়ে যায়।) ধূর্ত শয়তান তখন মানুষের বেশ ধারণ করে এসে বলল, পয়গাম্বরগণকে তোমরা অনেক ভালোবাসতে। মরণের পরে তারা তোমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেছেন। তাঁদের স্মরণের জন্য আমি তোমাদেরকে একটি মূর্তি বানিয়ে দিচ্ছি, এটাকে দেখে আশা করি তোমরা কিছুটা সান্তনা পাবে। নবীর বিরহে সৎ মানুষেরা তার এই পরামর্শ খুব ভালো মনে করে লুফে নিল। শয়তান প্রতিমা বানিয়ে দিল। যখন নবী-রাসূলের কথা স্মরণ হতো, তখন তাঁরা মূর্তিটাকে দেখত। আস্তে আস্তে যখন মূর্তির ভালোবাসা অন্তরে স্থান পেয়ে গেল, তখন শয়তান যুক্তি দিল যে, এসব প্রতিমার সামনে মাথা নত করলে, তাদের মধ্যেই ভগবানকে পেয়ে যাবে। প্রতিমা সম্পর্কে যেহেতু আগে থেকেই একটি ভক্তি-শ্রদ্ধা জন্মে ছিল, তাই খুব সহজেই তারা শয়তানের এই ফাঁদে পা দিল। মূর্তির সামনে মাথানত ও তাদের পূজা শুরু করে দিলো। এভাবেই এক আল্লাহর পূজা থেকে মানুষ প্রতিমা পূজা শুরু করে এবং র্শিকের ভয়াবহ পাপে নিমজ্জিত হয়ে যায়।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ যখন মাটি-পাথর প্রভৃতির সামনে মাথানত করল, তখনই সে অপদস্থ হলো এবং মালিকের দয়ার দৃষ্টি থেকে ছিটকে পড়ে চিরদিনের জন্য জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হলো। এরপর মহান আল্লাহ আরো নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁরা মূর্তি এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর পূজা থেকে মানুষকে বিরত থাকার উপদেশ প্রদান করেছেন। কেউ তাঁদের কথা গ্রহণ করতো, আবার কেউ প্রত্যাখ্যান করতো। যারা তাদের উপদেশ গ্রহণ করতো, তারা আল্লাহর নিকট প্রিয় পাত্র হয়ে যেতো। আর যারা প্রত্যাখ্যান করতো, আসমান থেকে তাদের ধ্বংস করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো।
রমেশ ভাই! আপনাকে আমি যে সব কথা বলছি, তা আমি জানতে পেরেছি আপনার আমার নবী (অবতার) মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাল্লামের মাধ্যমে। আপনাকে কি সেই নবী ও শেষ অবতার সম্পর্কে কিছু বলতে পারি?
রমেশ : হ্যাঁ বলুন, আমাদের ধর্মেও তো অবতারের কথা আছে। ঠিক আছে বলুন শুনি।
আব্দুল্লাহ : নবী বা অবতার হলেন মানুষের মধ্যে থেকে মহান মালিক এর নির্বাচিত কিছু বান্দা। তাদের কাছে ফেরেশতা তথা স্বর্গীয় দূতের মাধ্যমে বার্তা প্রেরণ করেছেন। যাঁরা মানবজাতিকে জীবন পরিচালনা পদ্ধতি এবং বন্দেগী তথা প্রভুর দাসত্ব করার নিয়ম বর্ণনা করেছেন এবং জীবনের প্রকৃত রহস্য বর্ণনা করেছেন। যা মানুষ বিবেকপ্রসূত জ্ঞান দ্বারা অর্জন করতে সক্ষম নয়। এ মহামানবদেরকে পয়গাম্বর বা অবতার বলা হয়। এখানে অবতার অর্থ হলো সেই মানব, যাঁর কাছে প্রভুর বার্তা আসে। বর্তমানে অবতার বলতে ওই সত্তাকে বুঝানো হয়, যিনি স্বয়ং প্রভু বা প্রভুররূপে আগমনকারী। এটা নিছক কল্পনাপ্রসূত বিশ্বাস। এই ভ্রান্তবিশ্বাস পোষণ করা মারাত্মক অপরাধ। এই ভ্রান্তবিশ্বাসই মানুষকে এক আল্লাহর পূজা-বন্দেগী থেকে সরিয়ে মূর্তি পূজায় নিয়োজিত করেছে।
এ সকল মহামানব, যাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা নবী রাসূলের মর্যাদায় সমাসীন করেছেন, সবযুগে সব এলাকায় আগমন করেছেন। তাদের আহ্বান ছিলো এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা, শুধু তারই পূজা ও গোলামী করা এবং তাঁর পক্ষ থেকে প্রদর্শিত জীবনবিধান অনুসরণ করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কোনো নবী এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পূজা-অর্চনা করতে বলেননি। বরং এই পাপ থেকেই তাঁরা মানুষকে বিরত রেখেছেন। তাঁদের কথায় মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করে সত্যপথ অবলম্বন করেছেন।
যতো নবী-রাসূল এসেছেন, সবার ধর্মের মূল বাণী ছিলো এক ও অভিন্ন। তাদের সবার আহ্বান ছিলো এক আল্লাহকে বিশ্বাস করো তার সত্তা ও গুণাবলীতে কাউকে শরিক করো না। তাছাড়া সকল পয়গাম্বরকে বিশ্বাস করো, ফেরেশতা বা স্বর্গীয় দূতের প্রতি এই বিশ্বাস করো যে তারা আল্লাহর এমন সৃষ্টি যাঁরা পানাহার করে না, ঘুমায় না, সকল কাজে তাঁরা আল্লাহর আনুগত্য প্রদর্শন করে। তিনি ফেরেস্তাদের মাধ্যমে যে ওহী, বার্তা বা গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, তা সত্য বলে বিশ্বাস করো, মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হয়ে কর্মফল ভোগ করতে হবে এই বিশ্বাস রেখো। ভালো মন্দ যা ভাগ্যে আছে সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, এই কথার ওপর বিশ্বাস রেখো। আর আমি পয়গম্বর এ সময় তোমাদের সামনে যে শরীয়ত এবং বিধান নিয়ে এসেছি তা অনুসরণ করে চলো।
যত নবী-রাসূল আগমন করেছেন এবং তাঁরা যে গ্রন্থ নিয়ে এসেছেন, সবই সত্য। তাদের সবার প্রতি আমরা একই ধরনের বিশ্বাস পোষণ করি। তাঁদের মধ্যে আমরা পার্থক্য করিনি। বাস্তবতার দাবি হলো, যাঁরা আল্লাহকে মানার দাওয়াত দিয়েছেন, তাদের শিক্ষায় এক প্রভুকে ছেড়ে অন্যের পূজা করা বা স্বয়ং তাদের পূজা করার নির্দেশ থাকতে পারে না। সুতরাং যে সব মহাপুরুষের শিক্ষায় মূর্তিপূজা বা একাধিক প্রভুর ইবাদতের কথা পাওয়া যায়, হয়তো তারা রাসূলই ছিলেন না। অথবা তাদের শিক্ষায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে।
মুহাম্মাদ -এর পূর্ববর্তী সকল রাসূলের শিক্ষায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হয়েছে। কোনো কোনো ধর্মের গ্রন্থই তো আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে।
রমেশ ভাই! আপনি কি মুহাম্মদ ও তার জীবনী সম্পর্কে কিছু জানেন?
রমেশ : তাঁর সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা আমার নেই। তবে এতটুকু জানি তিনি আপনাদের নবী।
আব্দুল্লাহ : আমি কি মুহাম্মদ সম্পর্কে কিছু বলতে পারি?
রমেশ : অবশ্যই বলুন, জ্ঞানের কথাতো শুনতে ভালোই লাগে।
আব্দুল্লাহ : ভাইয়া! আপনি যে বললেন মুহাম্মদ আমাদের নবী এটা ভুল ধারণা, কারণ মুহাম্মদ সকল মানুষের নবী। এটা আল্লাহ তাআলা নিজেই পবিত্র কুরআনে বলেছেনÑ ‘হে নবী! আপনি বলে দিন, হে মানব জাতি! আমি তোমাদের সকল মানুষের জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’ দেখুন এখানে আল্লাহ তাআলা বলেননি মুসলিম বা হিন্দু, বরং বলেছেন, ‘মানুষ’। আপনিও মানুষ আমিও মানুষ, অতএব মুহাম্মদ কে মানা আমার জন্য যতটুকু জরুরী, আপনার জন্য তাকে মানা ততোটুকুই জরুরী।
আল্লাহ তাআলা নিজেই তার পরিচয় দিয়েছেন, দেখুন আল্লাহ তাআলা কী বলেন-
‘তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। ইতপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।’
মুহাম্মদ হলেন সকল মানুষের নবী দেখুন এব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কী বলেন-
‘বলে দাও, হে মানবমন্ডলী! তোমাদের সকলের প্রতি আমি আল্লাহ্প্রেরিত রসূল, সমগ্র আসমান ও জমিনে তাঁর রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সকলে বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহ্র ওপর, তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর ওপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহ্র এবং তাঁর সমস্ত কালামের ওপর। তাঁর অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।’
মুহাম্মদ এর উপর আপনার বিশ্বাস আনতে হবে। এর জন্য আমি আপনাকেও দাওয়াত দিচ্ছি। দেখুন আল্লাহ তাআলা কি বলেন-

‘হে মানবজাতি! তোমাদের পালনকর্তার যথার্থ বাণী নিয়ে তোমাদের নিকট রসূল এসেছেন, তোমরা তা মেনে নাও যাতে তোমাদের কল্যাণ হতে পারে। আর যদি তোমরা তা না মানো, জেনে রাখ, আসমানসমূহে ও জমিনে যা কিছু রয়েছে সে সবকিছুই আল্লাহর। আর আল্লাহ হচ্ছেন সর্বজ্ঞ, প্রাজ্ঞ।’
মুহাম্মদ এর উপর শুধু বিশ্বাস রাখলেই হবে না। বরং তার আনুগত্যও করতে হবে। আল্লাহ তাআলা নিজেই এর নির্দেশ দিচ্ছেন-
‘আর যে কেউ আল্লাহ্র হুকুম এবং তাঁর রসূলের হুকুুম মান্য করবে, তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহ্ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাদের সঙ্গী হবে। তাঁরা হলেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।’
কেউ যদি মুহাম্মদ কে অমান্য করে, বা তাকে অস্বীকার করে, তাহলে তার কি ক্ষতি হতে পারে তাও আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
‘যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পরও এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ওই দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থল।’
এবার আপনাকে নবীজীর জীবনী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়ার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
সর্বশেষ পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মদ সম্পর্কে পৃথিবীতে আগত সকল নবী-রাসূল এবং তাদের ওপর অবতীর্ণ কিতাবসমূহে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এও বলে দেয়া হয়েছে, তিনি আগমনের পর এবং তাঁর পরিচয় লাভের পর, সমস্ত পুরনো ধর্ম এবং শরীয়ত ছেড়ে, শুধুমাত্র তাঁকেই মানতে হবে। তাঁর আনীত শরীয়ত মতেই চলতে হবে। ইসলাম সত্যধর্ম হওয়ার এটাও একটি প্রমাণ, পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে ব্যাপক বিকৃতি সাধনের পরও মহান মালিক শেষ নবী আগমনের সুসংবাদ সে সব কিতাবে অবিকৃত রেখে দিয়েছেন। যাতে কেউ বলতে না পারে, শেষ নবী ও আগমনের কথা আমরা জানতাম না। বেদের মধ্যে ‘নরাশংস’, পুরাণে অবতার, বাইবেলে ফারকালিত এবং বৌদ্ধ ধর্মের গ্রন্থে আখেরী বৌদ্ধ নামে শেষ নবীর কথা উল্লেখ আছে। ওই সব ধর্মীয় কিতাবে তাঁর জন্মস্থান, জন্মের বৃত্তান্ত
সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত মুুহাম্মদ এর পরিচয়
জন্ম .
সর্বশেষ নবী দু’জাহানের বাদশা হযরত মুহাম্মদ সৌদিআরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে, কুরাইশ বংশে পিতা আব্দুল্লাহর ঘরে মাতা আমেনার কোলে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ৮ই রবিউল আওয়াল রোজ সোমবার ভোরে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতার মৃত্যু
হযরত মুহাম্মদ মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন। তিনি হয়ে গেলেন এতিম।
কেসরার প্রাসাদ
হযরত মুহাম্মদ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই একটি আলো প্রজ্বলিত হলো, ফলে কেসরার প্রাসাদের শিখাচিরন্তন নিভে গেল এবং ফেটে গেলো প্রাসাদ।
দুধপান
হযরত মুহাম্মদ জন্মগ্রহণের পর প্রথম তিন চার দিন তাঁর মাতা বিবি আমিনা তাঁকে দুধ পান করান। অতঃপর তাঁর চাচা আবু লাহাবের আযাদকৃত দাসী ছুওয়াইবা নবীজীকে দুগ্ধদান করেন। আরবের সুপ্রাচীন প্রথার দরুণ বনু সাদ গোত্রের মহিলারা প্রতি বৎসর দুগ্ধপোষ্য শিশুর অন্বেষণে মক্কায় আসতো। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বনু সাদ গোত্রের ‘হালিমা সাদিয়া’। তাঁর সাথে ছিল স্বামী ও এক দুগ্ধপোষ্য শিশু। বাহন হিসাবে ছিল অত্যন্ত দুর্বল শীর্ণকায় এক গাধী এবং একটি উষ্ট্রী। হালিমাও ছিলেন দুর্বল ও অত্যন্ত রুগ্ন। সকলেই তাদের পছন্দের বাচ্চাদের নিয়ে নিল, কিন্তু হালিমার দুর্বলতার কারণে কেউ বাচ্চা দিল না।
যখন ফিরে যাওয়ার সময় হলো, তখন হালিমা তাঁর স্বামীর সাথে পরামর্শ করে এতিম শিশু মুহাম্মদ কেই সাথে নিলেন।
হালিমা সাদিয়া বলেন, এই ভাগ্যবান শিশুটিকে কোলে নেওয়া মাত্রই বরকত প্রকাশ পেতে শুরু করল। আমার স্তন ছিল একেবারে দুগ্ধুুহীন শুষ্ক, কিন্তু মুহাম্মদ কে কোলে নেওয়ার সাথে সাথে দুধে ভরে গেল। আমার স্বামী উষ্ট্রীর দুধ দোহন করতে গিয়ে দেখতে পেলেন উষ্ট্রীর স্তনও দুধে ভরপুর। আমি ও আমার স্বামী উদরপূর্তি করে তৃপ্তির সঙ্গে দুধ পান করলাম। বহুদিন পর রাত্রিটা বেশ আরাম ও সুখে অতিবাহিত হল।
বক্ষবিদারণ
হালিমা সাদিয়া তাকে লালন পালন করতে লাগলেন। যখন একটু বড় হলেন, তখন তিনি তাঁর দুধভায়ের সাথে মাঠে যেতেন। প্রতিদিনের মতো দুুধভাইয়ের সঙ্গে মাঠে গেলেন, তাঁর দুধভাই দেখলেন আকাশ থেকে সাদা পোষাক পরিহিত দু’জন ফেরেশতা এলেন এবং তাঁকে শোয়ায়ে তাঁর বুক বিদীর্ণ করে কি যেন ফেলে দিল। এ অবস্থা দেখে দুধভাই দৌড়ে বাসায় এসে মায়ের কাছে পুরো ঘটনা বলল। মা হালিমা দৌড়ে গিয়ে দেখলেন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, চেহারা বিবর্ণ। জিজ্ঞাসা করার পর তিনি পুরো ঘটনা বললেন।
রাসূল এর পুরো জীবনে মোট চার বার বক্ষবিদারণের ঘটনা সংঘটিত হয়। এরপর হালিমা রাসূল কে মক্কায় নিয়ে তাঁর মা আমেনার হাতে তুলে দিলেন।
মাতৃ¯েœহ থেকে চিরতরে বঞ্চিত
মুহাম্মদ তাঁর মায়ের সঙ্গে থাকতে লাগলেন। ছয় বছর বয়সে মা আমেনা তাঁকে নিয়ে মদীনা যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। সঙ্গে পুত্র মুহাম্মদ কেও নিয়ে নিলেন। ক্রীতদাসী উম্মে আয়মানও তাঁদের সঙ্গে গেলেন। ফিরার পথে আবওয়া নামক স্থানে মা আমিনা ছয় বছরের শিশু ‘মুহাম্মদ’কে এতিম বানিয়ে চিরদিনের জন্য আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে ইহকাল ত্যাগ করলেন। শিশু বয়সে মাকে হারিয়ে বিরহের বেদনা বুকে নিয়ে ক্রীতদাসীর সঙ্গে মক্কায় ফিরলেন। এরপর থেকে তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের দায়িত্ব পালন করেন।
দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর, তাঁর চাচা আবু তালিব এতিম নবীর অভিভাবক হোন।
শামের সফর
যখন হযরত মুহাম্মদ এর বয়স ১২ বছর তখন তাঁর চাচা আবু তালিবের সাথে শামদেশে রওনা হোন, চাঁচার ব্যবসায় সাহায্য করার জন্য। রাস্তায় যখন এক স্থানে বিশ্রামের জন্য অবস্থান করলেন তখন এই শেষ নবীর প্রতি এক খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর নজর পড়ল, যার নাম ছিল জারজীস বাহীরা রাহিব। তিনি তাঁকে দেখেই চিনে ফেললেন। কারণ, তিনি ইঞ্জিলে শেষ নবীর যে সমস্ত নিদর্শন পড়েছেন সবগুলো নির্দশন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ এর মধ্যে দেখতে পেলেন। তিনি তাঁকে দেখে খুবই আনন্দিত হলেন এবং চাচা আবু তালেবকে পরামর্শ দিলেন তাঁকে যেন মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ শামে অনেক ইহুদী থাকে, তাঁকে ইহুদীরা দেখে চিনে ফেলবে এবং তারা তাঁকে মেরে ফেলবে। পরিশেষে তাঁকে কাফেলার এক সাথীর সাথে মক্কায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
হিলফুল ফুযুল
তিনি যখন যুবক বয়সে উপনিত হন, মক্কায় অনাচার, অত্যাচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখলেন, এই সমস্ত অপকর্মগুলি বন্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি একটি সংগঠন তৈরি করেন, তার নাম রাখেন ‘হিলফুল ফুযুল’। এর মাধ্যমে অনেক অপকর্ম নির্মূল করতে সফল হন। তাঁর চলা-ফেরা, আদব-আখলাক, আমানতদারী ইত্যাদি পুরো মক্কায় প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে মক্কার সকল মানুষ তার কাছে নিজ মাল-সামান আমানত রাখতো। তাঁর প্রতি সকলেরই আস্থা ছিলো।
খাদীজা রা. এর সঙ্গে বিবাহ
খাদীজা রা. ছিলেন মক্কা নগরির সবচেয়ে ধনাঢ্য ও বড় ব্যবসায়ী মহিলা। মানুষের মাধ্যমে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। হযরত মুহাম্মদ এর সুনাম শুনে তাঁকে দিয়ে ব্যবসার একটি কাফেলা শাম দেশে পাঠান। তিনি অধিক লাভ করে মক্কায় ফিরে আসলেন। তাঁর সঙ্গীরা খাদিজা রা. এর কাছে খবর দিলেন। আমরা যখন তাঁর সাথে যাচ্ছিলাম পুরো পথে তাঁর শরীরে কোনো রৌদ্র লাগে নি। কারণ তিনি যে দিকে যান সেদিকে আকাশের মেঘ তাঁর মাথার ওপর ছায়া দিয়ে চলছিল। খাদীজা তাঁর ব্যবসায়ী কৌশল, বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান, আখলাক-চরিত্র দেখে তাঁর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। মুহাম্মদ এর চাচা তাঁদের বিয়ে পড়িয়ে দেন। বিয়ের সময় মুহাম্মদ এর বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর আর বিবি খাদিজা রা. এর বয়স ছিল ৪০ বছর।
[ বি.দ্র. অনেক অমুসলিম ভাইয়েরা প্রশ্ন তুলে যে নবীজী যৌনাসক্ত ছিলেন, (নাউজুবিল্লাহ) যদি তাই হতো তালে প্রথম বিয়ে ৪০ বছরের একজন মহিলাকে করতেন না, বরং কোনো যুবতী কুমারীকেই বিয়ে করতেন ]
নবুওয়াত প্রাপ্তি
৪০ বছর বয়সে হেরা পর্বতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই তিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হোন এবং ইসলাম প্রচার করতে আদিষ্ট হন ।
ইসলামের দাওয়াত
তারপর তিনি ইসলাম প্রচার করা শুরু করেন। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলমান হন আবুবকর (রা.)। মহিলাদের মধ্যে খাদিজা (রা.)। এভাবে আস্তে আস্তে মানুষের সামনে সত্য উন্মচিত হতে লাগলো এবং দলে দলে মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে লাগলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতের প্রচার ছিল খুবই গোপনে।
অবিশ্বাসীদের অত্যাচার
যারা সত্যকে দেখার ও জানার পরও ইসলামকে অস্বীকার করতো, তারা নিজেদের পদ টিকিয়ে রাখতে মুসলমান ও নবী এর বিরুদ্ধাচরণ করতো। যারা ইসলাম গ্ররহন করেছে তাদেরকে নির্মম ভাবে অত্যাচার করতো।
বেলাল হাবশী (রা.) এক অবিশ্বাসীর গোলাম ছিলেন। মুসলমান হওয়ার ফলে তাঁর মালিক উত্তপ্ত বালিতে শুইয়ে তাঁর বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে টানা হিঁচড়া করতো, আর ইসলাম ধর্ম ছেড়ে দিতে বলত। উত্তরে (এই জ্বালা যন্ত্রনা সহ্য করে) বলতেন, ‘আহাদ, আহাদ,’ আল্লাহ এক, আল্লাহ এক। এমন আরো অনেক মুসলমানের সাথে নির্মম অত্যাচার করেছে।
এরপরও তাঁরা ইসলামের মতো দৌলত ছাড়েন নি। কারণ ইসলামেই তাঁরা পেয়েছিলেন স্বর্গীয়স্বাদ ও প্রশান্তি।
তায়েফের সফর
মক্কা থেকে প্রায় ৭০কি.মি. দূরে তায়েফ শহর। নবীজী মানুষকে নরকের আগুন থেকে বাঁচাবার জন্য অস্থির হয়ে তিনি ছুটে গেলেন তায়েফবাসীকে নরকের চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে। তাদেরকে এক আল্লাহ ও মুহাম্মাদ এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার এবং মুসলমান হওয়ার দাওয়াত প্রদান করলেন। তারা আল্লাহর নবীকে চিনতে না পেরে তাঁকে অশালীন ভাষায় গালমন্দ করে। তাঁর ওপর পাথর নিক্ষেপ করে । শরীর থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। ফেরেস্তা এসে অনুমতি চাইলেন,
হে নবী! আপনি অনুমতি দিন; এ জাতিকে দুই পাহাড়ে চাপা দিয়ে ধ্বংস করে দেই। কিন্তু দয়াল নবী ক্ষমা করে দিলেন এবং উত্তর দিলেন, এরা বুঝেনি, আমাকে চিনেনি, এরা হয়তো মুসলমান হচ্ছে না, কিন্তু এদের পরবর্তী প্রজন্ম মুসলমান হবে। তাদের জন্য কোনো বদুআ না করে হেদায়াতের দু’আ করলেন।
মেরাজ
আল্লাহতাঁর বান্দা মুহাম্মদ কে মসজিদে হারাম (বাইতুল্লাহ-মক্কা মুকাররামা) থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত এক রাত্রে ঘুরিয়ে আনেন। তাঁর আরহণের জন্য স্বর্গ থেকে আল্লাহ‘বোরাক’ নামের একটি বাহন পাঠিয়ে ছিলেন। এই রজনীতেই আল্লাহতাঁকে স্বর্গ ও নরক দেখিয়েছেন এবং তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায উপহার দেন। তা মুসলমানদের জন্য ফরজ করা হয়।
মদিনা হিজরত
মক্কাবাসীরা মুহাম্মদ এর ওপর নির্যাতন করে, বয়কট করে অপপ্রচার করে, বিভিন্নভাবে বাধা দেবার পরও তারা ব্যর্থ হলো। দেখল দিন দিন মুসলমানদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। তখন তারা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিল, হযরত মুহাম্মদ কে তারা হত্যা করবে। তাই সকলেই মুহাম্মদ এর ঘরের চারপার্শে তরবারি নিয়ে বসে রইল। আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে তাঁর নবীকে জানিয়ে দিলেন এবং মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। হযরত মুহাম্মদ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কুরআনের একটি আয়াত পড়ে বালুতে ফুঁ দিয়ে কাফেরদের মুখের দিকে নিক্ষেপ করলেন। ফলে তারা টেরই পেল না, তিনি তাদের সামনে দিয়েই বের হয়ে আসলেন। মুহাম্মদ আবুবকর রা.কে নিয়ে জন্মভূমি ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করলেন। এদিকে মদিনাবাসীরা তাঁকে সানন্দে গ্রহণ করে নিলেন। মুহাম্মদ এর সাথে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)ও একে একে অনেকেই মদিনায় হিজরত করলেন।
মদিনায় খ্রিস্টানদের সাথে মুহাম্মদ এর আচারণ
মদিনায় বহু গোত্রের লোক বসবাস করতো। অধিকাংশ ছিল খ্রিস্টান। তাদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে বংশীয় ঝগড়া-ফাসাদ এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকতো। মুহাম্মদ সেখানে গিয়ে তাদের মধ্যে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করে দিলেন। পরস্পর প্রত্যেক গোত্রকে আপোষ করে দিলেন। খ্রিস্টানদের সাথে সৎব্যবহার করতেন এবং তাদেরকে বুঝাতেন। ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানাতেন।
বদর যুদ্ধ
হযরত মুহাম্মদ এর মদীনায় আসার পরও মক্কার কাফেরদের ক্ষোভ শেষ হয় নি। এবার তারা প্রস্তুতি নিল মদিনায় গিয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করবে। তাই তারা যুদ্ধের সরঞ্জামাদিসহ এক হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য বের হলো। যুদ্ধ হবে বদর প্রন্তরে। মুসলমানগণ যুদ্ধের জন্য বের হলেন। মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন। আল্লাহ্র শক্তিতে এই ৩১৩ জন সাহাবা এশহাজার সৈন্যের ওপর বিজয়ী হলেন। অবিশ্বাসীরা বহু সংখ্যক মৃত্যুবরণ করল এবং ৭০ জন বন্দি হলো। আল্লাহ ফেরেস্তাদের মাধ্যমে মুসলমানদের বিজয় দান করলেন। এভাবে আরো বহু যুদ্ধ-জিহাদ তিনি করেছিলেন।
অলৌকিক ঘটনা সমূহের কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো
চাঁদ দ্বিখ-িত হওয়া
একবার অবিশ্বাসীরা বিশেষ করে আবু জাহেল ও অন্যান্যরা মুহাম্মদ কে বলল। আমরা আপনাকে আল্লাহর সত্য রাসূল বা নবী বলে বিশ্বাস করবো এবং আপনার উপর ঈমান আনবো, যদি আপনি এই চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করতে পারেন। হযরত মুহাম্মদ আল্লাহর হুকুমে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন, সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল।
খাবারের মধ্যে বরকত
খন্দকের যুদ্ধে এক সাহাবী নবী মুহাম্মদ কে দাওয়াত দিলেন এবং সামান্য খাবার তৈরি করলেন। মুহাম্মদ সকল সাথীদের নিয়ে গেলেন এবং সামান্য খাবারই সকলকে পেটভরে খাওয়ালেন।
মক্কা বিজয়
৮ম হিজরিতে নবী মুহাম্মদ এর সাথে মক্কাবাসীরা একটি চুক্তি ভঙ্গ করে। ফলে আল্লাহ্র হুকুমে সঙ্গীদের নিয়ে মক্কায় রওনা হলেন এবং তা বিজয় করেন। কাবা শরীফে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। নবী মুহাম্মদ কুরআনের একটি আয়াত পড়ে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলেন। একে একে সবগুলো মূর্তি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল এবং ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা ।
বিদায় হজ্জ
১০ম হিজরীতে হযরত মুহাম্মাদ হজ্জ পালন করেন। ঐতিহাসিক আরাফাহ ময়দানে তিনি বিদায়ী ভাষণ দেন। তিনি বললেন, ‘হে লোক সকল ! আমি কি আমার রেসালাতের দায়িত্ব তোমাদের মাঝে পৌঁছিয়ে দিতে পেরেছি? সাহাবাগণ (রা.) উচ্চস্বরে বলে উঠলেন জি, আপনি হাতে কলমে তার হক আদায় করেছেন। সঙ্গী সাথীরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল ! এখন আমাদের কী কাজ? তিনি উত্তরে বললেন, আমার যেই কাজ তোমাদেরও একই কাজ। তখন তাঁর সঙ্গী সাথীরা বিভিন্ন দেশে ইসলাম প্রচার তথা মানুষকে নরকের চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য ছড়িয়ে পরলেন।
ইন্তেকাল
১১হিজরী সনে তিনি তাঁর উম্মতদের এতিম বানিয়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলেন। মদিনার মাটিতে নিজ বাসভবনেই তাঁর কবর মোবারক। সেখানে তিনি শুয়ে আছেন। তিনি তাঁর কবরে জীবিত। এ ছিল আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ -র সংক্ষিপ্ত জীবনী। বিস্তারিত জানার জন্য সীরাতগ্রন্থ পড়–ন।
আব্দুল্লাহ ভাই আপনি তো আমার অনেক বড় একটি ভুল ভাঙ্গিয়ে দিলেন। আমি তো এ বিষয়ে কিছুই জানতানম না। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
আব্দুল্লাহ : রমেশ ভাই আপনি কি জানেন মানুষের সবচে বড় ব্যাধি কী?
রমেশ : আপনিই বলুন সেটা কী?
আব্দুল্লাহ : শুনুন তাহলে মানুষের একটি মারাত্মক ব্যাধি হলো, পূর্বসূরিদের ভ্রান্তধারণা-বিশ্বাসকে অন্ধের মতো অনুসরণ করে। সুস্থ বিবেক ও যুক্তি-তর্কের সামনে অসারতা প্রমাণ হলেও বাপ-দাদার কীর্তি-কলাপ মানুষ ছাড়তে পারে না। পূর্ববর্তীদের রীতি-রেওয়াজ পরিত্যাগ তো দূরের কথা, কারো কথাই তারা শুনতে নারাজ। একারণেই রাসূল কে চল্লিশ বছর পর্যন্ত সত্যবাদী, বিশ্বাসী বলে সম্মান প্রদর্শনের পরও মক্কার লোকেরা তাঁর শত্রু হয়ে গেলো।

অগ্নিপরীক্ষা
রাসূল যতই সত্যের পথে আহ্বান করতে লাগলেন, ততবেশি তারা তাঁর শত্রুতা করতে লাগল। কিছু নরাধম ঈমানদার-বিশ্বাসীদেরকে প্রহার, আগুনে শোয়ানো, গলায় রশি বেঁধে টানাহেঁচড়া, পাথর বর্ষণ প্রভৃতি শাস্তি দিতে শুরু করে। কিন্তু রাসূল সবার জন্য দু‘আ করতেন, কারো থেকে প্রতিশোধ নিতেন না। রাতের পর রাত আল্লাহর দরবারে তাদের হেদায়াতের জন্য দু‘আ করতেন। একবার তিনি মক্কার লোকদের থেকে নিরাশ হয়ে তায়েফ শহরে চলে গেলেন। আশা ছিলো ওখানের মানুষ যদি ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু তায়েফের লোকেরা এই মহামানবকে অপমান করল। দুষ্ট ও বখাটে ছেলেদেরকে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিল। এরা তাঁকে নানা ধরনের গাল-মন্দ করে। পবিত্র দেহে পাথর নিক্ষেপ করে, এতে তিনি আহত হয়ে যান। আঘাতের ফলে তাঁর পা থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহে যখন কোথাও একটু বসতেন, ওই দুষ্টছেলেরা এসে আবার উঠিয়ে দিতো। তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো বদদু‘আ করেননি। বরং এই দু‘আ করেছেন- হে আল্লাহ! এদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং হেদায়াত দান করুন, এরা তো জানে না।
আল্লাহর বাণী ও বার্তা পৌঁছানোর অপরাধে তাঁকে নিজ শহর মক্কা ছাড়তে হয়েছে। চলে যেতে হয়েছে মাতৃভূমি ছেড়ে মদীনায়। মদীনায় থাকার সময়েও মক্কাবাসীরা তাঁকে শেষ করার জন্য বারবার সৈন্য প্রেরণ করেছে।

সত্যের জয়
সত্য চিরকাল বিজয়ী থাকে। এখানেও তার বিপরীত হয়নি। দীর্ঘ তেইশ বছরের কঠোর সাধনার পর তিনি সবার ওপর বিজয়ী হলেন। সত্যের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ আহ্বান সারা আরবের মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে এসেছিল। সারা পৃথিবীতে একটি অবিস্মরণীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে সকল স্তরের মানুষ এক আল্লাহর অনুগত দাসে পরিণত হয়েছিল।

অন্তিম উপদেশ
মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবী নিয়ে তিনি হজ্ব পালন করেন। এখানে তিনি সকল মানুষের সামনে অন্তিম উপদেশ প্রদান করেন। একথাও বলেছিলেন, মৃত্যুর পর যখন তোমাদের আমলের হিসাব নেয়া হবে, তখন আমার সম্পর্কেও তোমাদেরকে জিজ্ঞাস করা হবে-‘আমি কি আল্লাহর দ্বীন এবং সত্যের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছি’? সবাই বললেন, নিঃসন্দেহে আপনি পৌঁছিয়েছেন। তিনি আকাশের দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে তিনবার বললেন, আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থেকো, তুমি সাক্ষী থেকো, তুমি সাক্ষী থেকো। এর পর তিনি লোকজনকে লক্ষ্য করে বললেন, এই সত্য ধর্ম যাদের কাছে পৌঁছেছে, তারা যেনো ওই ব্যক্তির কাছে পৌঁছিয়ে দেয়, যাদের কাছে তা পৌঁছায় নি। তিনি একথাও বলেছেন, আমি সর্বশেষ নবী। আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না। তিনিই সেই শেষ নবী, নরাশংস ও কল্কি অবতার, যাঁর অপেক্ষায় আপনারা আছেন। পবিত্র কুরআনে আছে, ‘‘যাদেরকে আমি গ্রন্থ দিয়েছি, তারা সেই (পয়গাম্বরকে) তাদের সন্তানের মতোই চিনে। নিঃসন্দেহে তাদের একটি দল সত্য গোপন করে। ” Ñআল বাকারা:১৪৬
ভাইজান! এ কথা সত্য যে, প্রতিটি মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর মৃত্যুর পর কী হবে এ বিষয়ে আপনাকে কিছু জানাতে চাই। আপনি কি শুনবেন?
রমেশ : অবশ্যই শুনবো, বলুন আপনি।
আব্দুল্লাহ : দেখুন ভাই! সব চেয়ে বড় সত্য হলো, এই চিরন্তন মালিক তাঁর সত্যগ্রন্থ কোরআনুল কারীমে একটি সত্যের বাণী আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন : “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে”।
এ বাণীতে তিনি দু’টি জিনিস আমাদেরকে বুঝিয়েছেন, প্রথমাংশে বলেছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ মৃত্যু এমন অমোঘ সত্য, যা শুধু সকল ধর্ম ও মতের অনুসারীই কেবল নয় বরং ধর্মত্যাগী নাস্তিক-মুরতাদরাও তা অস্বীকার করে না। মৃত্যুর থাবার সামনে সবাই নত। বিচরণশীল প্রাণীরাও মৃত্যুর বাস্তবতা অনুধাবন করে মৃত্যুর ভয় আছে বলে বিড়াল দেখে ইঁদুর পালায় এবং চাপা পড়ার ভয়ে গাড়ি দেখে কুকুর দৌঁড়ে পালায়ন করে। সকল সন্দেহ-সংশয়ের ঊর্ধ্বে মৃত্যুর হাতছানি সকল প্রাণীকে আলিঙ্গন করবে।

মৃত্যুর পর কী হবে?
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে একটি চরম সত্য আমাদের সামনে উদ্ভাসিত করে দেয়া হয়েছে যা মানুষ বুঝতে পারলে পৃথিবীর রং বদলে যাবে। পৃথিবী তার শৃঙ্খলা ফিরে পাবে। সে সত্যটা হলো মৃত্যুর পর তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে, দুনিয়ার সকল কর্মের প্রতিদান দেয়া হবে। মৃত্যুর পর পচে গলে নিঃশেষ হবে না। হিসাব-নিকাশের জন্য পুনরায় সৃষ্টি না হয়ে অন্য কোনো প্রাণীর দেহে আত্মপ্রকাশ করবে, বিষয়টি এমন নয়। সুস্থ বিবেকের কাছে এমন দাবি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই! দেখুন আমরা পুনর্জন্মের বিশ্বাস করি। অর্থাৎ আমরা মৃত্যুর পর আবার জন্মগ্রহণ করব। যদি এই দুনিয়াতে ভালো কাজ করে যাই তাহলে ব্রাহ্মণ বা ভালো কিছু হয়ে পুনরায় জন্মগ্রহণ করব। আর যদি পাপ করে থাকি, তাহলে কুকুর বিড়াল বা কীট-পতঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করবো।
আব্দুল্লাহ : রমেশ ভাই! আপনার জেনে রাখা উচিৎ: পুনর্জন্মের মতবাদ বেদের মধ্যে নেই। পরবর্তীতে ‘পুরাণ’ এর মধ্যে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। পুনর্জন্মের বিশ্বাসে এ কথাই বুঝতে চাই যে, মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্যগুলো পিতা থেকে পুত্র এবং পুত্র থেকে তার পুত্রের মধ্যে স্থানান্তরিত হতে থাকে। মূলত পুনর্জন্মের মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে, এক শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য। মহান আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সৃষ্টির পর তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ রাখেননি। অভিশপ্ত শয়তান প্রথমে ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষের মধ্যে উঁঁচু-নিচু ভেদাভেদ সৃষ্টি করে। ধর্মের নামে দলিত ও নিজ সম্প্রদায় ‘শূদ্রদের সেবা গ্রহণকারী ও তাদেরকে নিচু জাত সাব্যস্তকারী’ ধর্মের ঠিকাদারদের কাছে যখন তারা জানতে চাইলেন, আমাদের সৃষ্টিকর্তা একজন, তিনি যেহেতু নাক, কান, চোখ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আমাদেরকে একই রকম বানিয়েছেন, তাহলে আপনারা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ এবং আমাদেরকে নিচুজাত বানালেন কেন? ধর্ম ব্যবসায়ীরা তখন নিজেদের স্বার্থরক্ষার তাগিদে পুনর্জন্মের দোহাই দিয়ে এই ফর্মূলা বাতলে দিলেন যে, ‘পূর্বের জীবনের কর্মফলই তোমাদেরকে নিচু বানিয়ে দিয়েছে।’ তখন থেকে এই মতবাদের জন্ম হয়। এই মতবাদের দৃষ্টিতে সমস্ত আত্মা পুনঃসৃষ্টি হয়ে কর্মফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আকৃতি ধারণ করে আবার পৃৃথিবীতে আত্মপ্রকাশ করে, মারাত্মক অন্যায়কারীরা উদ্ভিদ (বনস্পতির) রূপে পুনর্জন্ম লাভ করে এবং সৎকর্মশীলরা পুনর্জন্মের চক্র থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়।
পুনর্জন্ম মতবাদের বিরুদ্ধে তিনটি প্রমাণ
১.পুনর্জন্মের অসারতা প্রমাণে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলোÑ পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের তথ্যমতে, ভূপৃষ্ঠে সবার আগে সৃষ্টি হয়েছে উদ্ভিদ। এরপর জীব-জন্তু। তার আরো লক্ষ-কোটি বছর পর মানুষের অস্তিত্ব। তখন পর্যন্তযেহেতু মানুষের জন্মই হয়নি, কোনো আত্মা পাপ কর্ম করেনি, তাহলে কোন আত্মা ওই সব উদ্ভিদ এবং জীব-জন্তুরূপে সৃষ্টি হয়েছে?
২. পুনর্জন্মের মতবাদ বিশ্বাস করলে আবশ্যিকভাবে একথাও মানতে হবে যে, ভূপৃষ্ঠের প্রাণীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। কারণ, যে সব আত্মা পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তি পেয়েছে-সেই পরিমাণ প্রাণীর সংখ্যাও হ্রাস পাওয়ার কথা। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত পৃথিবীর মানুষ, জীব-জন্তু এবং উদ্ভিদ এর সংখ্যা অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়েই চলছে।
৩. পৃথিবীতে জন্মগ্রহণকারী ও মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যায় আসমান-জমিন ফারাক। মৃত্যুবরণকারী মানুষের তুলনায় জন্মগ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি। কখনো কখনো লক্ষ-কোটি মশা-মাছি জন্মলাভ করে, অথচ বাস্তবে মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যা হয় অনেক কম। তাহলে এতসব মশা-মাছি কার আত্মার রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আসে?
শিশুদের সম্পর্কে অনেক সময় শোনা যায় যে, পূর্বজন্মে যেখানে সে বসবাস করতো সেই জায়গা সে চিনতে পারছে, তার পূর্বের নাম বলে দিচ্ছে এবং পুনর্জন্মের কথা বলে দিচ্ছে; এগুলো শয়তান ও ভূত-প্রেতের কারসাজি। মানুষের দ্বীন-ঈমান ধ্বংস করার জন্য এরা শিশুর মাথায় প্রবেশ করে আবোল তাবোল কথা বলে। মরণের পর মানুষ প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরে যায় এবং দুনিয়ার কর্মফল হিসেবে শাস্তি বা পুরস্কার লাভ করে; এই প্রকৃত সত্যটি মৃত্যুর পর সবার সামনেই উন্মোচিত হবে।

কর্মের প্রতিদান মিলবে
যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে ও সৎপথে চলে, সে জান্নাতে (স্বর্গে) যাবে। জান্নাত হলো এমন পবিত্রতম স্থান, যেখানে আরাম-আয়েশের সব ব্যবস্থা বিদ্যমান। বিলাসিতা এবং বিনোদনের এমন সব উপকরণ সেখানে আছে, ‘যা দুনিয়ায় কোনো চক্ষু অবলোকন করেনি, কারো কর্ণ শোনেনি এবং কারো অন্তরে সে সবের কল্পনাও করেনি। স্বর্গ তথা জান্নাতের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে স্বচক্ষে মহান মালিকের দর্শন’। এর চেয়ে আনন্দের এবং খুশির আর কিছুই হতে পারে না।
আর যারা মন্দকর্ম করে, অসৎপথে চলে এবং মালিকের নির্দেশ অমান্য করে তারা জাহান্নামে যাবে। অনন্তআগুনে জ্বলবে। সব পাপাচারের শাস্তি তাকে দেয়া হবে। সবচেয়ে বড় শাস্তি হবে মহান মালিকের প্রিয় দর্শন থেকে বঞ্চিত হওয়া। তারা মালিকের কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই! জান্নাত-জাহান্নাম তো দেখা যায় না। তাহলে মৃত্যুর পর জান্নাত বা জাহান্নামের ব্যাপারে বিশ্বাস করবো কিভাবে?
আব্দুল্লাহ : এ সম্পর্কে আমাদের এতটুকু জেনে রাখা দরকার যে, সকল ধর্মগ্রন্থেই স্বর্গ-নরকের আলোচনা স্থান পেয়েছে। যদ্বারা প্রমাণ হয়, স্বর্গ-নরক তথা জান্নাত-জাহান্নামের বাস্তবতা সকল ধর্মালম্বীদের মতে স্বীকৃত।
একটি উদাহরণের মাধ্যমেও আমরা জান্নাত-জাহান্নামের বাস্তবতা বুঝতে পারি। বাচ্চা যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন যদি তাকে বলা হয় তুমি গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে দুধপান করবে, হাসবে, কাঁদবে, অনেক জিনিস দেখতে পাবে, গর্ভ অবস্থায় সে এগুলো বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু যখনই ভূমিষ্ঠ হয়ে বাইরের আলোতে চোখ মেলবে, তখন তার সব কথা বিশ্বাস হবে। এমনিভাবে পৃথিবীটা মায়ের গর্ভের মতো। মৃত্যুর পরে যখন আখেরাতের আলোতে চোখ মেলবে, তখন সবকিছু তার বুঝে আসবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো পরকালের জীবনে জান্নাত-জাহান্নাম, পুলসিরাত-মিযান প্রভৃতি সম্পর্কেও সত্যবাদী মহাপুরুষ সংবাদ দিয়েছেন, প্রাণের শত্রুও যাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যা দিতে পারে না এবং সেই কুরআন আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছে, যার সততা সম্পর্কে পৃথিবীর কোনো মানুষের সামান্যতম সন্দেহ নেই।
রমেশ ভাই! আমি আপনাকে পবিত্র কুরআন সম্পর্কে কিছু বলতে চাই আপনি কি শুনবেন?
রমেশ : হ্যাঁ বলুন, অবশ্যই শুনবো।
আব্দুল্লাহ : আল্লাহ তাআলার পবিত্র বাণী আল-কুরআন। শাশ্বত এই চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছেন,‘‘যদি তোমরা আমার বান্দা মুহাম্মদ এর উপর অবতীর্ণ কিতাবে কোনোরূপ সন্দেহ কর, তাহলে কুরআনের সূরার মতো একটি সূরা বানিয়ে নিয়ে এসো! আল্লাহ ছাড়া তোমাদের যত সহযোগী আছে, সবাইকে ডেকে নাও। যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।” -সূরা বাকারা : ৩৩
সুদীর্ঘ চৌদ্দশত বছর থেকে আজ পর্যন্তপৃথিবীর সকল সাহিত্যিক, কলামিস্ট, গবেষক, বিজ্ঞানী সবাই থমকে গেছে। কুরআনের অলৌকিকতার সামনে সবাই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। অকপটে সবাই স্বীকার করেছে, কুরআন কোনো মানুষের রচনা হতে পারে না।
রমেশ ভাই! যে কথাগুলো বললাম এগুলোর নাম হলো ইসলাম। এক মনে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা ও আমলে পরিণত করার নাম হলো ইসলাম। আমি আপনাকে সেই ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। আপনি যদি তা গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি অনন্তকালের জন্য চিরস্থায়ী নরক থেকে বেঁচে যাবেন।
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই! সমস্ত নবী-রাসূল ও আসমানী গ্রন্থসমূহ যখন সত্য, তাহলে একটা মানলেই তো হবে। ইসলাম গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তাটা কী?
আব্দুল্লাহ : বর্তমান সময়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া খুবই সহজ। আমাদের দেশে একটি পার্লামেন্ট আছে। সংসদের একটি সংবিধান আছে। এখানে যতজন প্রধানমন্ত্রী হয়ে এসেছেন, তারা সবাই প্রকৃত প্রধানমন্ত্রী। যেমনÑ এরশাদ, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং সময়ের পরিবর্তনে তারা যেসব আইন এবং সংশোধন পাস করেছেন, তা পালন করা সকল নাগরিকের ওপর বাধ্যতামূলক। পূর্বের প্রবর্তিত আইনের তখন কার্যকারিতা থাকে না। নতুন পাস হওয়া সংবিধানই সকল স্থানে কার্যকর হয়। এখন কেউ যদি বলে এরশাদ বাংলাদেশের প্রকৃত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাই আমি তার পাস করা আইন মানবো। নতুন সংশোধিত আইন মানবো না। নতুন সংবিধানের ধার্যকৃত কর আদায় করবো না, তাহলে এই লোককে সবাই রাষ্ট্রদ্রোহী বলবে। সে শাস্তির উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে। এমনিভাবে সকল ধর্ম এবং ধর্মগ্রন্থ স্ব-স্ব সময়ে এসেছে। সব ধর্মই সত্যের শিক্ষা দিয়েছে। এ জন্যই সমস্ত নবী-রাসূলকে এবং তাঁদের উপর নাযিলকৃত কিতাবকে সত্য বিশ্বাস করে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ -এর ওপর ঈমান আনা এবং তাঁর শরীয়ত মেনে চলা সকল মানুষের জন্য অপরিহার্য।
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই! তাহলে সত্য ধর্ম কয়টি ? কারণ সব ধর্মই ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যাবে। রাস্তা ভিন্ন হলেও গন্তব্য তো এক ও অভিন্ন, তাহলে অসুবিধাটা কোথায়?
আব্দুল্লাহ : সত্য ধর্ম একটিই। একথা বলা যাবে না যে, সব ধর্মই ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যাবে। রাস্তা ভিন্ন হলেও গন্তব্য তো এক ও অভিন্ন, এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সত্যপথ শুধু একটিই। অসত্য অনেক হতে পারে। যেমনÑআলোর উৎস একটিই হয়ে থাকে, আর অন্ধকারের উৎস অনেক হতে পারে। পৃথিবীর শুরু থেকেই সত্য ও মুক্তির পথ একটিই। এক আল্লাহকে মানা এবং এক ধর্মমতে অনুসরণ করার নামই ইসলাম। ধর্ম কখনো পরিবর্তন হয় না। সময়ের প্রয়োজনে শুধু শরীয়ত তথা বিধানের পরিবর্তন হয়। আর সেই পরিবর্তন এক মালিকের নির্দেশেই হয়। মানুষের বংশ এক। মালিক-স্রষ্টা এক। তেমনি তার মুক্তির পথও এক। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে আল্লাহর নিকট মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম।
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই! হযরত মুহাম্মদ সত্য এবং সর্ব শেষ নবী। এ কথার প্রমাণ কী?
আব্দুল্লাহ : এ প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। প্রথম কথা হলো, এই কুরআন বিশ্বস্রষ্টার বাণী। কুরআন সত্য হওয়ার ব্যাপারে তিনি যে সব সত্য প্রমাণ পেশ করেছেনÑতার চ্যালেঞ্জ গ্রহণের জন্য কেউ এগিয়ে আসতে সাহস করেনি। আজ পর্যন্তকুরআনের কোনো ভুল কেউ বের করতে পারেনি। সেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সত্যতা ও শেষনবী হওয়ার কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন।
দ্বিতীয় কথা হলো, হযরত মুহাম্মদ -এর সোনালি জীবনের প্রতিটি অধ্যায় পৃথিবীর সামনে সুস্পষ্ট। দুনিয়ার আর কোনো নবী বা মহামানবের জীবন, তাঁর জীবনের মতো এতো সুরক্ষিত ও সুস্পষ্ট নয়। তাঁর জানের দুশমন এবং ইসলাম ধর্মের ঘোর শত্রুও কোনো দিন এ কথা বলার সুযোগ পায়নি যে, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে কখনো মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। লোকেরা তাঁর সততার ব্যাপারে কসম খেতো। যে লোকটি তার ব্যক্তিগত জীবনে কোনো দিন মিথ্যার কাছে যাননি, তিনি আল্লাহ এবং ধর্মের নামে কী করে মিথ্যা কথা বলতে পারেন? তিনি নিজেও বলেছেন, আমি সর্বশেষ নবী আমার পর আর কোনো নবী আসবেন না। অন্য সকল ধর্মগ্রন্থে ‘অন্তিম ঋষি’, ‘কল্কি অবতার‘ প্রভৃতি নামে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে পরিচয় দেয়া হয়েছে, তিনিই হলেন হযরত মুহাম্মাদ । এবং বর্ণিত নিদর্শনগুলো তাঁর ওপরই পুরো পাওয়া যায়।
রমেশ : আব্দুল্লাহ ভাই! এই ঈমানের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
আব্দুল্লাহ : মৃত্যুর পরের যিন্দেগীর প্রশ্ন ছাড়াও এই নশ্বর পৃথিবীতে আপনার জন্য ঈমান ও ইসলামের আবশ্যকতা বিদ্যমান। মহান মালিকের দরবার ছেড়ে যে নরাধম নিজ ক্ষুদ্র সৃষ্টির সামনে মাথা নত করে, সে পশুর চেয়েও অধম। একটি নিকৃষ্ট কুকুরও প্রভুর দরবার ছেড়ে অন্য কোথাও যায় না। কিছু পাবার আশায় তার দরবারেই পড়ে থাকে। তাহলে কত নিকৃষ্ট হলে মানুষ নিজের প্রকৃত মালিকের দরবার ছেড়ে অন্যের দরজায় মাথা ঠেকাতে পারে।
দুনিয়াতে যেমনই হোক মরণের পরে, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই, মৃত্যু কামনা করলেও যেখানে মৃত্যু আসবে না, সেখানে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঈমানের প্রয়োজন হবে আরো অনেক বেশি। দুনিয়া থেকে মানুষ ঈমান ছাড়া পরপারে পাড়ি জমালে, চিরদিনের জন্য জাহান্নাম বা নরকের আগুনে জ্বলতে হবে। দুনিয়ায় সামান্য আগুনের ফুলকি কারো শরীরে লাগলে শিউরে ওঠে। তাহলে জাহান্নামের অনন্তআগুন যা দুনিয়ার আগুন থেকে সত্তর গুণ শক্তিশালী, কীভাবে আমরা সহ্য করবো। সর্বদা সেই আগুনে পুড়তে হবে, এক চামড়া পুড়ে ছাই হয়ে গেলে নতুন চামড়া লাগানো হবে। এই শাস্তি অনন্তকাল বিরামহীন চলতে থাকবে।
রমেশ ভাই! জানি না কখন মৃত্যুর হাতছানি এসে যাবে ! ভিতরের নিঃশ্বাস বাইরে বেরুবে, এই ভরসাও নেই। বাইরের শ্বাস ভিতরে প্রবেশ করার আশাও নেই। মৃত্যুর আগেই সুযোগ। সুযোগ থাকতেই নিজের সর্বপ্রথম ও প্রধান দায়িত্ব সম্পর্কে ভাবুন। ঈমান ছাড়া ইহকাল ও পরকালীন জীবনের কী মূল্য আছে? একটু পরে সবাইকে মালিকের সামনে দাঁড়াতে হবে। সেখানে সর্বপ্রথম ঈমানের হিসাব নেয়া হবে। এই আহ্বানে আমার স্বার্থ হলো, আপনাকে প্রশ্ন করা হলে এ কথা বলতে পারবেন না যে, আমাদের কাছে ঈমানের দাওয়াত পৌঁছেনি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, আপনার অন্তরে এই সত্যটি বদ্ধমূল হয়েছে। সুতরাং আর দেরি নয়, আসুন হে হৃদয়বান ভাই আমার! মহান সত্তাকে সাক্ষী রেখে মনের গভীর থেকে উচ্চারণ করুন-‘‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু” অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত আর কেউ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর সত্য বান্দা ও রাসূল।
আমি কুফুর, র্শিক এবং সমস্ত পাপ থেকে তাওবা করছি। আর অঙ্গীকার করছি সৃষ্টিকর্তা, সত্য মালিকের সমস্ত বিধান মেনে চলব এবং তাঁর পয়গাম্বর মুহাম্মদ -এর পুরোপুরি আনুগত্য করবো। পরম করুণাময় দাতা ও দয়ালু আল্লাহ আমাকে এবং আপনাকে মৃত্যু পর্যন্ততাঁর পথে অবিচল রাখুন। আমিন!
রমেশ ভাই! আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনিত ধর্ম হলো ইসলাম, এ কথা আল্লাহ তাআলা বলেছেন- “নিঃসন্দেহে আল্লহ্র নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম একমাত্র ইসলাম।”
আলে-ইমরান ৩:১৯
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন- অর্থ: যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম কামনা করবে তার থেকে তা কখনই কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
Ñআলে-ইমরান:০৩:৮৫

রমেশ ভাই! এই ঈমান ও বিশ্বাসের ওপর যদি মৃত্যু পর্যন্তচলতে পারেন, তাহলে বুঝবেন এই অধম কেমন ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার হক আদায় করেছে।
রমেশ: আব্দুল্লাহ ভাই! এই ইমান আনলে লাভ কি? আর না আনলে ক্ষতি কি?
আব্দুল্লাহ: রমেশ ভাই! ইসলাম গ্রহণ করার সবচাইতে বড় লাভ হল তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। যেমন রসুল বলেনÑ الاسلام يهدم ماكان قبله ইসলাম তার পূর্বের সকল পাপকে ক্ষমা করে দেয়।
অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণ করার সাথে সাথে বে গুনাহ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে। আরো আপনার জন্য অপেক্ষা করছে চির শান্তির স্থান জান্নাত। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন- “শুন যে-কেহ আল্লাহর নিকট সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে এবং সৎকর্মপরায়ণ হয় তাহার ফল তাহার প্রতিপালকের নিকট রয়েছে এবং তাদের কোনো ভয় নেই তারা দুঃখিতও হবে না।” সূরা বাকারা:১১২
নিশ্চয় যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকে দাখিল করাবেন উদ্যানসমূহে, যার তলদেশ দিয়ে নির্ঝরণীসমূহ প্রবাহিত হবে। তাদেরকে তথায় স্বর্ণ-কঙ্কন ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং তথায় তাদের পোশাক হবে রেশমী। -সূরা হজ্ব:২২:২৩
আর আপনি যদি ইমান না আনেন তাহলে আপনাকে চিরকালের জন্য নরকের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে ও জাহান্নামের কঠিন আগুনে জ্বালানো হবে। আল্লাহ তাআলা কোরআনে ইরশাদ করেন-

“এই দুই বাদী-বিবাদী, তারা তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে বিতর্ক করে। অতএব যারা কাফের, তাদের জন্যে আগুনের পোশাক তৈরি করা হয়েছে। তাদের মাথার ওপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়া হবে।”
Ñসূরা হজ্ব:২২:১৯
আল্লাহ আরো বলেন “ফলে তাদের পেটে যা আছে, তা এবং চর্ম গলে বের হয়ে যাবে।”
Ñসূরা হজ্ব:২২:২০
আরো বলেন- “তাদের জন্যে আছে লোহার হাতুড়ি।”
Ñসূরা হজ্জ-২২:২১
অন্য ভাবে তিনি বলেনÑ “তারা যখনই যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে তাতে ফিরিয়ে দেয়া হবে। বলা হবে: দহনশক্তি আস্বাদন কর।”
Ñসূরা হজ্জ: ২২:২২

রমেশ : এবার আমার বুঝে এসেছে মালিক আমাকে তার দলভুক্ত করতে চাচ্ছেন আর আমার মনও সাক্ষি দিচ্ছে ইসলামই একমাত্র সঠিক ধর্ম। ঠিক আছে আপনার কথা মেনে নিলাম। এখন কি আমার কোনো দায়িত্ব আছে?
আব্দুল্লাহ : হ্যাঁ রমেশ ভাই! আপনার দায়িত্বের কথা বলার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে নিই, আর তা হলো, ইসলাম ও ঈমান আনার ফলে আপনার কিছু পরীক্ষা আসতে পারে। মনে রাখবেন, জয় সত্যের পক্ষেই হয়। এখানেও হকের বিজয় হবে। সারা জীবনও যদি পরীক্ষার মধ্যে কাটাতে হয়, তবুও এই ভেবে সহ্য করে নিবেন যে, এই দুনিয়ার জীবন তো খুবই সামান্য ক’দিনের মাত্র। মৃত্যুর পর আসছে অনন্তকালের জীবন। অসীম জীবনের সুখ সমৃদ্ধি, প্রভুর সন্তুষ্টি এবং প্রিয়তমের দর্শন লাভের বিনিময়ে এই ক’দিনের পরীক্ষা তেমন কিছুই নয়।

আপনার দায়িত্ব
আল্লাহ আপনাকে তাঁর রহমতের কোলে ও সত্যের ছায়ায় আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁর রহমতের কোলে আপনাকে স্থান দিয়েছেন। ঈমান এবং ইসলামের সত্যতা আপনার সামনে উদ্ভাসিত করে দিয়েছেন। অনেক মানুষের কাছে এখনো ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি। তাদেরকে ঈমানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া এখন আপনার দায়িত্ব। সত্যের দাওয়াত পৌঁছে দেয়াও আপনার রক্ষিত আমানত ও অধিকার। রাসূল এর মতো অন্তর্জ¡ালা নিয়ে আপনিও তাদেরকে ঈমানের পথে ডাকুন। ভ্রাতৃত্ব এবং সহমর্মিতার দাবিতে আল্লাহর গযব এবং জাহান্নামের আগুন থেকে তাদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা করুন। তাদের সুপথ প্রাপ্তির জন্য মালিকের দরবারে কান্নাকাটি করুন। অন্ধ মানুষ অজান্তেঅগ্নিকুন্ডে পড়তে যাচ্ছে দেখে কোনো চক্ষুষ্মান ব্যক্তি যদি মুখ ঘুরিয়ে রাখে এ কথাটিও না বলে যে, তোমার এ পথ চলে গেছে সোজা অগ্নিকুন্ডে। তাহলে মানুষ বলে পরিচয় দেয়ার কোনো অধিকার তার আছে কি? মানবতার দাবি তো হলো, ‘তাকে যে কোনো মূল্যে আগুন থেকে ফেরাতে হবে এবং সাধ্য থাকতে তাকে কিছুতেই আগুনে পুড়তে দেয়া যাবে না’ এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা। ঈমান আনার পর সকল মুসলমানের কর্তব্য হলো, কুফুর এবং র্শিকের আগুন থেকে মানবজাতিকে উদ্ধার করার কাজে আত্মনিয়োগ করা। হাতে-পায়ে ধরে পথভোলাকে ঈমানের পথে তুলে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করা। নিঃস্বার্থ এবং প্রকৃত সমব্যথীর সুরে কথা বললে অন্তরে প্রভাব সৃষ্টি না করে পারে না।
রমেশ: অনেক অনেক ধন্যবাদ আব্দুল্লাহ ভাই, আপনি আমার বড় উপকার করলেন, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান করুন। আমিন । ভাই আজ তাহলে বিদায় নিই, আবার দেখা হবে । ইসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আল্লাহ: না :ভাই ধন্যবাদ কিসের আমি তো আমার দায়িত্ব পালক করেছি। আল্লাহ আপানকেও উত্তম প্রতিদান দান করুন। ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সমাপ্ত
যুবায়ের আহমদ
পরিচালক : ইসলামী দাওয়াহ্ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ
মান্ডা শেষ মাথা, মুগদা, ঢাকা-১২১৪
০১৯১৭ ৫৯৭ ৫৫১